হিসাব
-"বাবা, তোমাকে আমি গত কাল ৫০০০ টাকা দিয়েছিলাম বাজারের জন্য। তুমি আজ এসে বলছো টাকা শেষ? চাল, ডাল আর সামান্য কিছু সবজি কিনতেই ৫০০০ টাকা শেষ হয়ে গেলো? তুমি কি আমাকে বোকা পেয়েছো?"
রাফাতের গলার আওয়াজ চড়া। সোফায় বসে থাকা বৃদ্ধ বাবা, আজহার সাহেব, মাথা নিচু করে আছেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন,
-"বাবা, জিনিসের যা দাম বেড়েছে... মাছের বাজারেই তো ১৫০০ টাকা গেলো। তারপর তেল, মসলা..."
-"থামো তো! আমি কি বাজারে যাই না? আমি জানি না কোনটার দাম কত? তুমি নিশ্চয়ই দোকানদারের কাছে ঠকে এসেছো, অথবা টাকাটা হারিয়ে ফেলেছো। প্রতিবার তোমার এই এক অজুহাত, দাম বেড়েছে। আমার হাড়ভাঙা খাটুনির টাকা এভাবে পানিতে ফেললে সংসার চলবে কীভাবে?"
রাফাত রাগে বাজারের ব্যাগটা রান্নাঘরে ছুড়ে দিয়ে তার রুমে চলে গেলো। আজহার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে আস্তে উঠে নিজের ঘরে গেলেন।
পরের মাসের পহেলা তারিখ। রাফাত সকালে তৈরি হয়ে বললো,
-"বাবা, এ মাসে তোমাকে আর বাজারে যেতে হবে না। তুমি বুড়ো হয়েছো, হিসাব বোঝো না। দোকানদাররা তোমাকে ঠকায়। আজ ছুটির দিন, আমি নিজেই বাজার করবো। তুমি শুধু ফর্দটা দাও।"
আজহার সাহেব চুপচাপ পকেট থেকে একটা কাগজের ফর্দ বের করে দিলেন। রাফাত ফর্দটা হাতে নিয়ে পকেট থেকে ৫০০০ টাকা বের করে মানিব্যাগে রাখলো। মনে মনে ভাবলো,
'বাবা নিশ্চয়ই উল্টাপাল্টা খরচ করে। আজ আমি দেখিয়ে দেবো কীভাবে ৫০০০ টাকায় পুরো মাসের বাজার করে আরও ৫০০ টাকা সেভ করা যায়।'
রাফাত বাজারে গেলো। প্রথমে চালের দোকানে। মিনিকেট চালের দাম শুনে তার চোখ কপালে উঠলো। গত মাসের চেয়ে কেজিতে ৬ টাকা বেড়েছে। ৫ কেজিতেই ৩০ টাকা নাই। এরপর তেলের দোকান। সয়াবিন তেলের বোতলের গায়ে এমআরপি দেখে সে দোকানদারের সাথে তর্কে জড়ালো। কিন্তু লাভ হলো না। মাছ বাজারে গিয়ে সে আরও বিপদে পড়লো। বাবার ফর্দে লেখা রুই মাছ (বড়)। কিন্তু ৫০০০ টাকার বাজেটে বড় রুই মাছ কিনলে সবজি কেনার টাকা থাকে না। সে বাধ্য হয়ে ছোট সাইজের মাছ কিনলো। গরুর মাংসের দিকে তাকানোর সাহসই হলো না।
ঘণ্টা দুয়েক পর। রাফাত ঘর্মাক্ত শরীরে বাসায় ফিরলো। তার হাতে দুটো ব্যাগ। কিন্তু ব্যাগ দুটো কেমন যেন খালি খালি। সে ডাইনিং টেবিলে ব্যাগ রাখলো। হিসাব মেলাতে বসলো।
চাল, ডাল, তেল, লবণ, মাছ (ছোট), আর কিছু সবজি। এতেই তার ৫২০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। পকেট থেকে আরও ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। অথচ ফর্দে এখনো ডিটারজেন্ট, সাবান, আর ডিম বাকি আছে।
রাফাত অবাক হয়ে গেলো। বাবা তাহলে গত মাসে ৫০০০ টাকায় এত কিছু আনলেন কীভাবে? তাও আবার বড় মাছ সহ? সে তো বাবাকে চোর অপবাদ দিয়েছিলো!
রাফাত হিসাব মেলাতে পারছে না। সে মায়ের কাছে গেলো।
-"মা, একটা কথা বলো তো। বাবা গত মাসে ৫০০০ টাকায় এত বাজার করলো কীভাবে? আমি তো আজ ৫২০০ টাকা খরচ করেও ফর্দের অর্ধেক জিনিস আনতে পারলাম না!"
মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ম্লান হাসলেন।
-"তোর বাবা তোকে বলেনি, পাছে তোর ইগোতে লাগে। গত এক বছর ধরে জিনিসের দাম অনেক বেড়েছে, কিন্তু তুই তো প্রতি মাসে সেই ৫০০০ টাকাই দিচ্ছিস। তুই ভাবিস ৫০০০ টাকায় এখনো সংসার চলে।
তোর বাবা প্রতি মাসে নিজের ডায়াবেটিসের ওষুধের টাকা থেকে ১০০০ টাকা বাঁচাতেন, আর পুরোনো খবরের কাগজ বিক্রি করা জমানো টাকা দিয়ে ওই ঘাটতি পূরণ করতেন। তিনি বাজারে গিয়ে নিজের জন্য সস্তা বিড়ি কিনতেন না, রিক্সায় না চড়ে হেঁটে আসতেন, যাতে সেই বাঁচানো টাকা দিয়ে তোর পাতে বড় মাছটা তুলে দিতে পারেন।
তুই বাবাকে হিসাব বোঝে না বলে গালি দিলি, অথচ তোর বাবা গত এক বছর ধরে নিজের আয়ু কমিয়ে তোর সংসারের বাজেট মিলিয়ে যাচ্ছেন।"
রাফাত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার হাতে ধরা বাজারের ফর্দটা কাঁপছে। সে বুঝতে পারলো, মধ্যবিত্ত বাবারা এমন এক জাদুকর, যারা শূন্য পকেট নিয়েও সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য গণিতের সব সূত্র ভুল প্রমাণ করে দিতে পারেন।
সে দৌড়ে বাবার ঘরে গেলো। আজহার সাহেব তখন চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে পুরোনো একটা পত্রিকা পড়ছিলেন। রাফাত গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-"বাবা, আমি ফেল করেছি। তোমার সংসারের অংক মেলানোর সাধ্য আমার নেই। আগামী মাস থেকে বাজার তুমিই করবে, আর বাজেট আমি দ্বিগুণ করে দেবো।"
(সমাপ্ত.....)
#অণুগল্প
#হিসাব
#ইয়াছিরআরাফাতরামিম
এরকম আরো গল্প পেতে ফলো করুন