“সৎ মানুষ বারবার ঠকে, আর অসৎ মানুষ বারবার জিতে—তাহলে সমাজ আসলে কাকে সফল বলে?”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
বর্তমান সমাজে সফলতার সংজ্ঞাটা ধীরে ধীরে বদলে গেছে। আগে সফল মানুষ বলতে বোঝানো হতো চরিত্রবান, মানবিক ও সম্মানিত কাউকে। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সফলতা মাপা হয় টাকা, গাড়ি, বাড়ি, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রভাব দিয়ে। মানুষ আর জানতে চায় না সেই সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে; বরং দেখে কার কাছে কত আছে। ফলে একজন অসৎ ব্যক্তি যখন দুর্নীতি করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, তখন সমাজের একাংশ তাকে “সফল” বলেই মনে করে। আর এখান থেকেই শুরু হয় নৈতিকতার অবমূল্যায়ন।
দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে মানুষের বিবেককে অসাড় করে দেয়। একজন মানুষ যখন দেখে সত্য কথা বলে সে সুযোগ হারাচ্ছে, ঘুষ না দেওয়ায় তার কাজ আটকে যাচ্ছে, কিংবা নীতির কারণে সে পিছিয়ে পড়ছে—তখন তার ভেতরে হতাশা জন্ম নেয়। সে ভাবতে শুরু করে, “সৎ থেকে লাভ কী?” এভাবেই সমাজে অসততার প্রতি এক ধরনের নীরব গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার বদলে সেটাকেই “বাস্তবতা” বলে মেনে নেয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অসৎ হয়ে পাওয়া সফলতা কখনো প্রকৃত সফলতা নয়। কারণ সফলতা শুধু অর্থ বা ক্ষমতার নাম নয়; সফলতা মানে মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও মানুষের আন্তরিক শ্রদ্ধা। একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি হয়তো অনেক সম্পদের মালিক হতে পারে, কিন্তু সে কখনো নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। তার ভেতরে সবসময় ভয় কাজ করে—কখন তার মুখোশ খুলে যাবে, কখন মানুষ তার আসল চেহারা চিনে ফেলবে। অন্যদিকে একজন সৎ মানুষ হয়তো ধীরে এগোয়, কিন্তু তার আত্মসম্মান থাকে অটুট। সে অন্তত আয়নায় নিজের মুখ দেখে লজ্জা পায় না।
সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে এখন “দ্রুত সফল হওয়া”র প্রবণতা ভয়ংকরভাবে বেড়ে গেছে। মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। সবাই শর্টকাট খুঁজছে। কেউ রাতারাতি ধনী হতে চায়, কেউ দ্রুত পরিচিতি পেতে চায়। আর এই তাড়াহুড়োর সুযোগ নিয়েই অসততা সমাজে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কারণ নৈতিকতার পথে সফল হতে সময় লাগে, পরিশ্রম লাগে, আত্মত্যাগ লাগে। কিন্তু অসৎ পথে অনেক কিছু খুব দ্রুত পাওয়া যায়। তাই অনেকেই সাময়িক লাভের জন্য নিজের বিবেক বিক্রি করে দেয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যখন সমাজে অসৎ মানুষদের সম্মান দেওয়া শুরু হয়। একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যদি শুধু টাকার কারণে সমাজে সম্মান পায়, তাহলে নতুন প্রজন্ম কী শিখবে? তারা তো দেখবে—সৎ থেকে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে অসৎ হয়ে বিলাসী জীবনযাপন করাই ভালো। তখন ধীরে ধীরে পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ সত্যবাদিতাকে বোকামি আর প্রতারণাকে “স্মার্টনেস” ভাবতে শুরু করে। এই পরিবর্তন একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর সংকেত।
তবে এর মানে এই নয় যে সৎ মানুষেরা সবসময় হেরে যায়। সত্যিকারের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, দীর্ঘমেয়াদে সৎ মানুষরাই মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। অসৎ মানুষ হয়তো কিছু সময়ের জন্য ক্ষমতাবান হয়, কিন্তু তাদের পতনও অনেক ভয়ংকর হয়। কারণ অন্যায় কখনো স্থায়ী হয় না। মিথ্যার ভিত্তি যত শক্তই মনে হোক, একসময় তা ভেঙে পড়েই। পৃথিবীর প্রতিটি সমাজেই এমন উদাহরণ আছে, যেখানে দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী মানুষ শেষ পর্যন্ত অপমান, ঘৃণা ও একাকীত্বের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে একজন সৎ মানুষ হয়তো জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করে, কিন্তু তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কখনো নষ্ট হয় না। তার মৃত্যুর পরেও মানুষ তাকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে। কারণ চরিত্রই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। টাকা, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সততা ও মানবিকতা মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে।
আজকের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার। শুধু বই পড়ে শিক্ষিত হলেই হবে না; মানুষকে ভালো মানুষও হতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব জায়গায় যদি সততা ও মানবিকতার মূল্য শেখানো না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু প্রতিযোগিতা শিখবে, কিন্তু নীতি শিখবে না। তখন তারা সফল হওয়ার জন্য যেকোনো পথ বেছে নিতে দ্বিধা করবে না।
আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে, সৎ থাকা মানে দুর্বল হওয়া নয়। বরং অসৎ হওয়ার সুযোগ থাকার পরও সৎ থাকা অনেক বড় শক্তির পরিচয়। কারণ সততা ধরে রাখা সহজ নয়। প্রতিদিন অসংখ্য প্রলোভন, চাপ ও অন্যায়ের মাঝেও যে মানুষ নিজের নীতি ধরে রাখতে পারে, প্রকৃত সাহসী মানুষ আসলে সে-ই।
তাই “যে সমাজে সৎ মানুষ ঠকে, সেখানে অসৎ হওয়াটাই সফলতা”—এই কথাটি হয়তো বাস্তবতার এক অংশ তুলে ধরে, কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত সত্য বলা যায় না। কারণ সাময়িক লাভ আর প্রকৃত সফলতা এক জিনিস নয়। অসৎ মানুষ হয়তো দ্রুত উপরে ওঠে, কিন্তু তাদের ভিত থাকে দুর্বল। আর সৎ মানুষ হয়তো ধীরে এগোয়, কিন্তু তাদের অবস্থান হয় দৃঢ় ও সম্মানজনক।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার সম্পদের জন্য নয়, তার চরিত্রের জন্যই স্মরণীয় হয়। তাই এই সমাজ যতই কঠিন হোক, সততা কখনো মূল্যহীন নয়। কারণ অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্য ও নৈতিকতার আলো একদিন ঠিকই পথ দেখায়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

