জীবন এক্, সংঘর্ষ একাধিক!

in Incredible India14 hours ago (edited)

1000033168.jpg

নবনীতা আজ ৬০ বছর পূর্ণ করলো, এ বছরের জন্মদিনের হাত ধরে জীবনে দুটি বিষয় সংযোজন হলো!
প্রথম সে সিনিয়র সিটিজেনের আওতাভুক্ত হলো, আর দ্বিতীয় আসলো অবসর।

এত বছরের চাকরি জীবনে যতিচিহ্ন এঁকে সম্বর্ধনা এবং শেষ জন্মদিন অফিসের সহকর্মীদের সাথে কাটিয়ে বাড়ি ফিরল!

একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া নবনীতার মনে কাজ করছিল বাড়ি ফিরতে ফিরতে;
একদিকে এক্ ক্লান্তিকর প্রতিদিনের রুটিনে পরিবর্তন, অন্যদিকে একসাথে কাজকরা সহকর্মীদের সহচর্য চির দিনের জন্য স্থগিত হয়ে যাওয়ার কষ্ট!

নবনীতার এক্ ছেলে আর এক মেয়ে। উভয় সন্তান বিবাহিত, কন্যা থাকে বিদেশে আর পুত্র সন্তান নিজের পেশাগত কারণে থাকে চেন্নাইতে,
মেয়ের বিয়ে নবনীতা সম্বন্ধ করে করলেও, ছেলে নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছে।

নবনীতার পুত্র এবং পুত্রবধূ উভয়ই ডাক্তার। মেয়ে বিদেশের একটি বড় কোম্পানিতে কর্মরত এবং নবনীতার জামাই প্রফেসর।

নবনীতা যখন স্বামী কে হারিয়ে ফেলে তখন উভয় সন্তান ছিল একেবারেই ছোট।
বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যেই নবনীতার স্বামীর ক্যান্সার ধরা পড়ে!

এরপর নবনীতার জীবনে নেমে আসে একের পর এক্ প্রতিকূলতা।
নবনীতার স্বামীর পরিবার হাত তুলে দেয় চিকিৎসার খরচ তারা বইতে নারাজ!
সেই সময় আজকের এই অবসর নেওয়া কোম্পানিটি দাঁড়িয়েছিল নবনীতার পাশে।

সেদিন থেকেই নবনীতা ভেবেছিল উভয় সন্তানের মধ্যে একজনকে ডাক্তার সে তৈরি করবে, অর্থের কারণে চিকিৎসা করাতে না পারা মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

নিজের সর্বোচ্চ প্রয়াস দিয়ে স্বামীকে ধরে রাখতে চাইলেও পারেনি নবনীতা, কালের হাত ধরে তার স্বামী যখন পরলোক গমন করে, তখন নবনীতার মাথার উপর বাড়িটিও ছিল না!

চিকিৎসার কারণে, বাড়ি এমনকি নিজের বিয়ের সমস্ত গহনা সে বিক্রি করে দিয়েছিল।
এরপর, সে ঠিক করে বাবার বাড়িতে না গিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকবে দুই সন্তানকে নিয়ে।

1000033177.jpg

জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল সেদিন!
ঘরে বাইরে সমানভাবে নিজেকে সমর্পিত করতে করতে কখন যে সিনিয়র সিটিজেন এর কোটায় পৌঁছে গেছে নবনীতা আজ নিজের গাড়িতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সে কথাই ভাবছিল সে!

জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছে আজ নবনীতা যেনো জীবনের পুরোনো পাতাগুলো উলটে উপলব্ধি করছিল,

"জীবন এক্ হলেও সংঘর্ষ একাধিক।"

আজ নবনীতার হয়তো অর্থের অভাব নেই, নাহ্! সে কোনো সন্তানের অর্থের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং উভয়ের লেখাপড়া সহ তাদের বিয়ে সবটাই সামলেছে একলা হাতে।

যখন বয়স কম ছিল, অনেক সম্পর্কের হাতছানি পেয়েছে, বাবার বাড়ি থেকে তাকে পুনরায় সংসার করবার পরামর্শ পেয়েছে, কিন্তু কোথাও যেনো স্বামীর চিকিৎসা সহ সন্তাদের প্রতি কর্তব্য কে সে প্রাধান্য দিয়েছে, সাথে সে চায়নি তার সন্তানদের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ভাগ হয়ে যাক।

মনে মনে নিজেকে উদ্ভুদ্ধ করেছে তাকে জয়ী হয়ে অনেক উত্তর দিতে হবেই এবং তার প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে নিরবতাকেই সে বেঁচে নিয়েছিল।

চাইলেই হয়তো মেয়েকে আর্থিক সাহায্য করতেই পারতো তার বাবার বাড়ির লোকজন, যখন তার স্বামী অসুস্থ কিন্তু তাদের প্রাধান্য ছিল, তাদের একমাত্র পুত্র।
আর ঠিক সেই কারণেই স্বামী পরলোক গমন করবার পর নবনীতা আর ফিরে যায়নি বাবার বাড়িতে।

মায়ের সংঘর্ষ নবনীতার দুই সন্তান দেখেছে খুব কাছ থেকে, আর দেখেছে অর্থহীনতা কিভাবে কাছের সম্পর্কগুলোকে পর করে দেয়, একঘরে করে দেয়।

নবনীতার এখন ভালো বন্ধু তার এই দুই সন্তান, আর কি চাই!
ফিরতে ফিরতে নবনীতা মনে মনে ঠিক করলো, এবার সে কিছুদিন ছেলের কাছে গিয়ে থাকবে, আবার কিছুদিন মেয়ের কাছে।

এর আগেও অনেকবার তারা যেতে বললেও কাজের প্রতি দায়িত্বের কারণে সে পারেনি।
যে কাজ তার অসময়ে হাত ধরে রেখেছিল শক্ত করে, তাকে কি করে অবজ্ঞা করবে নবনীতা?
এটাই তো ছিল তার লড়াইয়ের একমাত্র হাতিয়ার।

1000033167.jpg

বাড়ী পৌঁছে উপহারগুলো ড্রয়িং রুমের টেবিলে রেখে ফ্রেশ হয়ে এক্ কাপ চা নিয়ে সোফায় বসতে না বসতেই ফোনের স্ক্রিনে যে নামটা ভেসে উঠলো সেটা আর কারোর নয় অনিন্দ্যর!

নবনীতার জীবনের একটি গোপন অধ্যায় যেটি সে কোনোদিন কারোর কাছে প্রকাশ করে নি।
কারণ, এই সমাজে পুরুষদের অনেক বিষয়ে ছাড় থাকলেও মহিলাদের থাকে না, তাদের জন্য থাকে সমালোচনা।

এই অনিদ্য হলো নবনীতার স্বামীর বন্ধু। যেদিন থেকে নবনীতার স্বামী চলে গিয়েছে সেদিন থেকেই ছায়াসঙ্গী হিসেবে পাশে থেকেছে কিন্তু বিনিময়ে কোনো শর্ত রাখেনি।

অনিন্দ্য আজও অবিবাহিত, সে একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী।
নবনীতার সমস্ত লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছে, যোগাযোগ রেখেছে কিন্তু আগ বাড়িয়ে নবনীতার আবেগ, আত্মসম্মানকে ক্ষুণ্ন করেনি কখনও, কারণ অনিন্দ্য বেশ ভালো বুঝেছিল নবনীতা আত্মসম্মানের সাথে আপোষ করবার মানুষ নয়।

নবনীতা নিজেও সম্মান করে অনিন্দ্য কে, সে যখন যখন মনে চাপ অনুভব করতো প্রথম যে নামটা তার মনে আসত সেটা এই অনিন্দ্য।

যদিও একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যেখানে অনিন্দ্য নবনীতার পাশে সেই সময় দাঁড়িয়েছিল, যখন কাছের সম্পর্কগুলো মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল, সেটা স্বামীর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া থেকে দুই সন্তানের বিয়ে, সব ক্ষেত্রেই অনিন্দ্য নবনীতার পাশে থেকেছে।

অনেক বাঁকা হাসি নবনীতাকে সহ্য করতে হয়েছে কিন্তু তারজন্য সে কখনোই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।

সম্মান যে অর্জন করতে হয়, সেটার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো নবনীতা! তাই, সাহস করে অনিন্দ্য নিজের মনের অনুভূতি প্রকাশ করবার সাহস দেখায়নি কোনোদিন, সে এই বন্ধুত্বকে সম্মান করেছে।

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে প্রথমেই জন্মদিনের অভিনন্দন জানালো অনিন্দ্য, এত বছর ধরে মন থেকে সে এই কাজটি করে এসেছে।

নবনীতা জানালো, এইবার আমার ছুটি কাটানোর সময় এসে গিয়েছে, এবার ছেলে মেয়ের সাথে সময় কাটাবো।

অনিন্দ্য খুশি হলো শুনে, অনেক লড়াই করেছে নবনীতা আজ সত্যি খানিক বিশ্রাম প্রয়োজন তার! নিজের দিকে তাকাবার সময় পায়নি নবনীতা, তাই অনিন্দ্য বললো, এবার একটু নিজের কথা যেনো সে ভাবে।

নবনীতা কোনোদিন জহির না করলেও সে জানে অনিন্দ্য তাকে কতখানি ভালবাসে।
আর ঠিক সেই কারণে এই নিজের দিকে তাকাবার অর্থ সে বুঝতে পারলো।

খানিক কথা বলে ফোন রেখে সে ছেলেকে ফোন করলো, কিন্তু ফোন বেজে গেলেও ফোন তুললো না নবনীতার ছেলে।

একজন চিকিৎসকের অনেক দায়িত্ব, হয়তো অপারেশন থিয়েটারে আছে! এরপর ছেলের বৌ এর ফোন নম্বর মিলিয়ে দেখল সেটিও বেজে গেলো!

মনে মনে নবনীতা ভাবলো, আজকে কিছু ভালোমন্দ রান্না করতে বলবে রাতের খাবারে, সঙ্গে অনিন্দ্য এবং অফিসের কিছু কাছের সহকর্মীদের বাড়িতে আসতে বলবে।

সেইমত সকলকে একে একে ফোন করে, রান্নার আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে গেলো নিজেও রান্নার জন্য রাখা দুই গৃহকর্মীর সাথে।

সময়মতো সকলেই হাজির হলো কিন্তু কোনো সন্তানের থেকেই শুভেচ্ছা বার্তা পেলো না নবনীতা!

পরের দিন নবনীতা মেয়েকে ফোন করলো, মেয়ে ফোন ধরে নিজের সমস্যার কথা জানাতে ব্যস্ত থাকলেও মায়ের বিষয় নিয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলো না!

তবে, এটা জানতে ভুল করলো না, অবসরের পর তার মা কত টাকা পেয়েছে!

এক্ দিন, দু'দিন করে কেটে গেলো এক সপ্তাহ কিন্তু ছেলে কিংবা ছেলের বউ থেকে কোনো ফোন না পেয়ে বেশ চিন্তিত হলো নবনীতা!

সে ঠিক করলো টিকিট কেটে চেন্নাই গিয়ে সে উভয়কে সারপ্রাইজ দেবে।
পরের দিনের জন্য ফ্লাইট টিকিট কেটে নবনীতা পৌঁছে গেলো ছেলের ফ্ল্যাটে।

সেখানে অপেক্ষা করছিল নবনীতার জন্য চমক!
দরজায় বেল বাজানোর পর যিনি দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো, সেটি একটি অপরিচিত মুখ!

নবনীতা নিজের ছেলের নাম বলে, নিজের পরিচয় দিল, এবং উত্তরে জানলো এই ফ্ল্যাট তার ছেলে বর্তমান বাসিন্দাদের বিক্রি করে দিয়েছে।

এবার অগত্যা নবনীতা বৌমা এবং ছেলে উভয়কে ফোন করলেও কেউ ফোন না ধরায় একটি স্থানীয় হোটেলে গিয়ে উঠলো নবনীতা।

সে ঠিক করলো পর দিন ছেলে জে নার্সিংহোমে কর্মরত সেখানে সে যাবে, সেইমত পরদিন সেখানে গিয়ে ছেলের সাথে দেখা হলো অবশেষে নবনীতার।

তবে, নবনীতা লক্ষ্য করলো, তার এই না বলে আসাটা তার ছেলে ভালোভাবে নেয় নি।
ছেলেকে নবনীতা প্রশ্ন করলো, ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেবার কথা এক্ বারের জন্য কেনো জানাবার প্রয়োজন বোধ করেনি তার সন্তান?

তখন ছেলে উত্তর দিলো, সে এবং তার স্ত্রী মিলে একটি বাংলো তৈরি করছে, এবং এই মুহূর্তে তারা এই বিষয়টি নিয়ে ব্যস্ত।

পাশাপশি সে তার মাকে হোটেলেই থাকতে বলে নিজের কাজে চলে গেলো এই বলে সে পরে ফোনে যোগাযোগ করে নেবে।

নবনীতার ব্যক্তি জীবনের পরিসর কেমন যেন ছোট হয়ে গেলো এক্ মুহুর্তের মধ্যে!
সে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে হোটেলে ফিরল, সেই রাতে ছেলে ফোন করে মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা চাইলো তার নব নির্মিত বাংলোর জন্য।

এই মুহূর্তে ছেলে রয়েছে তার শশুর বাড়িতে, তাই তার মাকে হোটেলে থাকতে বলেছে।

সবটা শুনে নবনীতা কোনো প্রত্যুত্তর ছাড়াই ফোন রেখে দিলো।
পরের দিন ছেলেকে কিছু না জানিয়েই নবনীতা ফিরে এলো।
এক্ অজানা দম বন্ধ করা কষ্ট তাকে ঘিরে ধরলো সাথে শূন্যতা!

বাড়িতে পৌঁছে আজকে প্রথম নবনীতা নিজেকে বড্ড অসহায় মনে করছিল, হঠাৎ করে নবনীতার মনে পড়ে গেলো অনিন্দ্যর বলা কথাটা, এবার নিজের কথা ভাবার উপদেশ!

আচ্ছা, নবনীতার কি এই বয়সে নিজের জীবন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ?
সমাজ তথা সন্তান সকলকে পিছনে ফেলে তার কি অনিন্দ্যর অব্যক্ত ভালোবাসায় সাড়া দেওয়া ঠিক হবে এই বয়সে?
ভেবে দেখবেন তো নবনীতার জায়গায় নিজেদের রেখে, আপনি হলে কি সিদ্ধান্ত নিতেন?

1000010907.gif

1000010906.gif