যে হারায় সেই বোঝে, হারানোর বেদনা কি!..
সৃষ্টিকর্তার নিয়ম বড়ই কঠিন৷ আমরা চাইলেও তার নিয়মের বাইরে গিয়ে বেশি কিছু করতে পারি না৷ আমাদের হাজারও পরিকল্পনা থাকলেও, বাস্তবায়ীত হবে তার পরিকল্পনা। পৃথিবীর কিছু নিয়ম আমার খুবই অবাক করে। ৫০/৬০ বছরের জীবনে আমরা কত কিছুই না করি, কিন্তু যত কষ্ট আর ত্যাগ শিকার করে সেগুলো করা হয়, ভোগ আর করা হয় না৷ হয়ত জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত চেষ্টা করে যায় জীবনটাকে সুন্দর করার। কিন্তু সেটার পিছনে উদ্দেশ্য থাকে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে। কষ্টের পরে যখন একটু শান্তির নীড়ে আরাম করে ঘুমাতে চান, তখনই সৃষ্টিকর্তার নিয়ম এসে তাকে দুনিয়ার জীবন থেকে বিদায় দিয়ে পরলোকের জীবনে পাঠায়ে দেয়। যে জীবনে নিজের জন্য কিছুই হয় না, সে জীবন নিয়ে কেন আমাদের এতো হতাশা, দুশ্চিন্তা, আর না পাওয়ার কষ্ট। যদি নিজে কষ্টে অর্জিত সকল কিছু নিজে ভোগ করতে পারতাম, তাহলে হয়ত যেকোনো ত্যাগ হাসিমুখে মেনে নেওয়া যেত। এই দুনিয়ার জীবনকে সাজাতে গিয়ে মৃত্যুর পরে যে আমাদের জন্য আরও একটা জীবন অপেক্ষা করতেছে, সেই কথা ভুলেই যায়৷ মহান আল্লাহ তায়ালা যে জীবনে জন্য কিছু সঞ্চয় করে নিয়ে কবরে যেতে বলেছেন, সেদিকে যেন আমাদের কারুরই খেয়াল থাকে না৷
পৃথিবীর অনেকেই সৃষ্টিকর্তার অনেক নিয়মকে অশিকার করলেও মৃত্যুকে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ ও জীব বিশ্বাস করে। সবাইকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়৷ পৃথিবীতে যতই আমরা আলিশান বাসভবন বানায় না কেন, সবাইকে সেটা ছেড়ে একদিন মাটির ঘরে যেতে হবে। না থাকবে বিছানা, না থাকবে কোন আলো। সত্যি বলতে আমার দুনিয়ার এই রং তামাশার প্রতি বেশি ঝোক নাই। শুধু দুনিয়াতে বেঁচে থেকে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দী করে ইমানের সাথে মৃত্যু বরণ করতে পারলেই আলহামদুলিল্লাহ। আমরা আমাদের দুনিয়ার জীবনে সবচেয়ে বেশি হতাশা আর দুশ্চিন্তায় কাটায়, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। একজন পিতা মাতা তাদের জীবনের সবটুকু দিয়ে তার সন্তানের ভালো কামনা করেন। যাতে সন্তানের ভবিষ্যৎ ভালো হয়। কিভাবে সন্তানের স্বপ্নগুলো ইচ্ছাগুলো পূরণ করা যায় সেদিকে সব সময় খেয়াক রাখেন। এই পৃথিবীতে মনে হয় মায়ের মতো কেউ সন্তানকে ভালোবাসে না এবং বাবার মতো হয়ত কেউ সন্তানের জন্য কষ্ট শিকার করে পরিশ্রম করে না।
এই দুইজন মানুষ যাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায় তারা জানে পিতা মাতা হারালে কতটা কষ্ট হয়। কিন্তু আমরা এমন কিছু সন্তান আছি, যারা পিতা মাতাকে সম্মান করে না বরং তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। আমাদের ইসলাম ধর্মে বলা হয়, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। এই জান্নাত যার হারিয়ে যায় সেই বোঝে। বাবা হলেন বটবৃক্ষের মতো সন্তানকে আগলে রাখে। গত বুধবার হঠাৎ একটা ফোন কলে বুকটা কেপে উঠেছিল। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে, রাতের শেষ টিউশনিটা পড়াচ্ছিলাম, তখন রাত ৮ টা বাজে মাত্র। হঠাৎ এক ছোট ভাই কল দিল সে এবার ডুয়েট এডমিশন দেওয়ার জন্য গাজিপুরে আছে। মাঝে মাঝেই ফোন দিয়ে পড়াশুনার বিষয়ে পরামর্শ করে এবং কিভাবে কি করবে জিগায়৷ প্রায়ই আমার রুমে আসে দেখা করতে। সেদিন কল দিয়ে বলতেছিল-
- ভাই কি করব?
- পড়াশুনা ঠিক মতো হচ্ছে না? রিভিশন দিতে পারি না?
- পড়তে বসলে খালী ঘুম পায়?
- ঘুম আসলে এলাম বাজলেও উঠতে পারি না?
এসব শুনে আমি কিছু সময় একটু বকাবকি করলাম রুটি ঠিক করার জন্য এরপর রুটিনের বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে কল কেটে দিলাম। কল কাটার ২ মিনিট মতো পরেই আবার কল দিয়ে কান্না স্বরে বলতেছিল ভাই, আমার আব্বু নাকি স্ট্রক করছে, আমার শরীর কাপতেছে, বাড়ী যাব কেমনে। গাজিপুর থেকে ওদের বাড়ী প্রায় ২৫০ কিলোমিটারের পথ। আমি বললাম তুমি থাকো আমি আসতেছি, এরপর আমি রেডি হয়ে ওর মেসের দিকে যেতে গিয়েই দেখি ও রেডি হয়ে আমার এক বন্ধুর সাথে আসতেছে। ভাবলাম, ছোট মানুষ কান্না করতেছে, ওকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসি৷ এক মিনিট মতো হাটার পরই ওর ফোনে একটা কল আসল, তখনই জানলাম ওর আব্বু মারা গেছে। খবরটা শুনতেই কান্নায় ভেঙে পরল। মনের অজান্তেই মনটা আমারও ভেঙে গেল৷ কিভাবে ছোট ভাইকে শান্তনা দিব বুঝতে পারতেছিলাম না।
কোন রকম নিজেকে কন্ট্রোল করে, এগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গেলাম। যেহেতু ও খুব ভেঙে পরেছিল, এজন্য আমি ডাইরেক বাসে তুলে দেওয়ার জন্য চান্দনা পর্যন্ত গেলাম। ছেলেটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। আসলে মাথার উপরের ছাদ না থাকলে যেমন হয়, বাবা মারা গেলে তার চেয়ে বেশি কষ্টে থাকে। রাত ১০:৩০ টার গাড়ীতে উঠায়ে দিয়ে আমি রাত ১২ টার পর মেসে আসলাম। আমারও শরীর খারাপ লাগতেছিল, এই ঘটনার পর থেকে নিজেও কিছু ভালো লাগতেছিল না। শুধু ভাবতে ছিলাম, দুনিয়ার কোন রঙ তামাশার জন্য এতো কিছু করতেছি, যেখানে জানিই না কত দিন বেঁচে থাকব। কোন রকম নিজেকে শান্ত করে একটু বিছানায় মাথা দিয়ে ঘুম আসার চেষ্টা করতেছিলাম, তখনই সেই ছোট ভাই আবার কল দিয়ে কান্না করতেছিল। আবার একটু কোন রকম বুঝিয়ে কলটা রাখলাম। আসলে যার হারায় সেই বোঝে হারানোর কি বেদনা।
গত বছর আমিও আমার অনেক কাছের মানুষকে হারিয়েছি। এজন্য হারানোর বেদনা কিছুটা হলেও বুঝি। এজন্য আমাদের সবার উচিত, শুধু দুনিয়া নিয়ে নয়, মৃত্যু জন্যও নিজেকে প্রস্তুত করা। যাতে মৃত্যুর পরে কিছুটা হলেও শান্তি পেতে পারি।
আজকে একটু মনের চাপা কষ্টগুলো আপনাদের মাঝে তুলে ধরলাম, সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আবারও দেখা হবে আমার পরবর্তী পোষ্টে।





Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
Thank you