হেলমেটsteemCreated with Sketch.

-"এই নোংরা, ঘামের গন্ধওয়ালা হেলমেটটা তোমার ব্যাগে কেনো তারেক? তুমি তো বাইক চালাও না! কার বাইকে, কাকে পেছনে বসিয়ে প্রতিদিন রাত দশটা পর্যন্ত ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াও তুমি?"

সুমির চিৎকারে তারেক চমকে উঠলো। তারেক একটি প্রাইভেট কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। সে মাথা নিচু করে ক্লান্ত গলায় বললো,
-"আরে, এটা আমার অফিসের এক কলিগের হেলমেট। ওর বাইকটা নষ্ট হয়ে গেছে, তাই আমার কাছে রাখতে দিয়েছিলো।"

-"মিথ্যা কথা! তুমি আমাকে বোকা পেয়েছো?"
সুমি রাগে ফেটে পড়লো।
-"গত দুই মাস ধরে তুমি রোজ রাত দশটায় বাসায় ফিরছো। তোমার শার্টে ধুলোবালি আর রাস্তার কড়া রোদে পোড়া ঘামের গন্ধ থাকে। তুমি এসি রুমে বসে কাজ করো, তোমার গায়ে রাস্তার ধুলোর গন্ধ আসবে কেনো? আমি নিশ্চিত তুমি অন্য কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছো। আমি আর এই সংসারে থাকবো না!"

তারেক কোনো উত্তর দিলো না। সে কোনো প্রতিবাদও করলো না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়াশরুমে চলে গেলো গোসল করতে। সুমি ড্রইংরুমে বসে একা একা কাঁদতে লাগলো। তার সাজানো সংসারটা একটা হেলমেট আর সন্দেহের কারণে ভেঙে যাচ্ছে।

পরদিন দুপুরবেলা। সুমি তার বোনের বাসা থেকে ফিরছিলো। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। গনগনে রোদে রিকশায় বসে সুমি ঘামছে। জ্যামে আটকা পড়ে তার রিকশার ঠিক পাশেই একটা রাইড-শেয়ারিং বাইক এসে থামলো। বাইকের পেছনের যাত্রী ভাড়া মিটিয়ে চলে গেলো।

চালক বাইকটা সাইড করে স্ট্যান্ড করলো। তারপর ঘামে ভেজা মাথা থেকে ভারী হেলমেটটা খুললো। পকেট থেকে একটা পুরোনো রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে সে রাস্তার পাশের টং দোকান থেকে এক গ্লাস পানি চাইলো।

সুমির চোখ দুটো স্থির হয়ে গেলো। তার বুকের ভেতরটা যেনো কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ওই বাইক চালক আর কেউ নয়, তার স্বামী তারেক।

অফিসের সেই ইস্ত্রি করা শার্টটা ধুলোয় মলিন, রোদে পুড়ে মুখটা কালো হয়ে গেছে। যে মানুষটা এসির নিচে বসে ফাইল সই করে, সেই মানুষটা এই কাঠফাটা রোদে সামান্য এক গ্লাস পানির জন্য রাস্তার ধুলোয় দাঁড়িয়ে আছে!

সুমির চোখের সামনে হঠাৎ তিন মাস আগের একটা স্মৃতি ভেসে উঠলো। তাদের একমাত্র ছেলের ক্লাস ওয়ানে ভর্তির সময়। সুমি জেদ ধরেছিলো, তার বান্ধবীদের ছেলেমেয়েরা যে নামিদামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে, তার ছেলেকেও সেখানেই পড়াতে হবে। ভর্তি ফি ছিলো প্রায় ষাট হাজার টাকা।

তারেক বলেছিলো,
-"সুমি, আমার বেতনে এতো টাকা দেওয়া সম্ভব না। আমরা ওকে একটা ভালো বাংলা মিডিয়ামে দিই।"
সুমি সেদিন রেগে গিয়ে বলেছিলো,
-"তুমি কেমন বাবা? একটা ছেলের ভর্তির টাকা জোগাড় করার মুরদ নেই তোমার? আমার বান্ধবীদের সামনে আমার স্ট্যাটাস বলতে কিছু থাকবে না। ধারদেনা করো, যা ইচ্ছা করো, আমার ছেলেকে ওখানেই ভর্তি করাতে হবে!"

তারেক সেদিন চুপ করে ছিলো। পরের দিন সে হাসিমুখে এসে বলেছিলো,
-"ভর্তির টাকা ম্যানেজ হয়ে গেছে। অফিস থেকে লোন নিয়েছি।"

সুমি রিকশায় বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তারেক কোনো লোন নেয়নি। সে অফিস শেষ করে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ভাড়ায় বাইক চালায়। পরিচিত কেউ যেনো চিনে না ফেলে, তাই সবসময় হেলমেট আর মাস্ক পরে থাকে। পাছে স্ত্রীর স্ট্যাটাস নষ্ট হয় বা স্ত্রী লজ্জিত হয়, তাই সে বাইকটা বাসার গ্যারেজে না রেখে দূরের একটা গ্যারেজে রাখে। কিন্তু হেলমেটটা চুরি যাওয়ার ভয়ে নিজের ব্যাগে লুকিয়ে বাসায় নিয়ে আসে।

আর সুমি তাকে সন্দেহ করেছে পরকীয়ার?

রাত দশটা। তারেক বাসায় ফিরলো। সে তৈরি হয়েই ছিলো যে আজকেও সুমি হেলমেট নিয়ে ঝগড়া করবে। কিন্তু সুমি ঝগড়া করলো না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তারেকের কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রাখলো। তারেকের ঘামে ভেজা শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে ডুকরে কেঁদে উঠে তারেকের বুকে মাথা রাখলো।

-"আমাকে মাফ করে দাও তারেক। আমার ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়বে না। কালই আমি ওকে ওই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনবো। তুমি আর ওই হেলমেটটা ব্যাগে ভরবে না। আমার মিথ্যা স্ট্যাটাসের চেয়ে আমার স্বামীর গায়ের ঘামের দাম অনেক বেশি।"

তারেক অবাক হয়ে তার স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। মধ্যবিত্ত সংসারের সব ঘাম আর ধুলোবালি এক নিমিষেই যেনো ভালোবাসার জলে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেলো।

(সমাপ্ত.....)

#অণুগল্প
#হেলমেট
#ইয়াছিরআরাফাতরামিম

Sort:  

Hi @yasirarafatramim

This post is detected as an AI Content by @abuse-watcher. Your steemit profile is under observation list.

Visit our Steemwatcher portal for watching plagiarism activities of abusers.
https://abuse-watcher.com/

Caught ByAbuse TypeDownvotePlag Src
@darkeyeAI ContentNolink
  1. Guidelines for Steemit Users
  2. Our Downvote Policy


Contact us on our discord server in appeal channel Discord Server