লাইনsteemCreated with Sketch.

-"দোস্ত, আমার বাবাকে নিয়ে আমি আর পারলাম না! মানুষটার বয়স হয়েছে, কিন্তু জেদ একটুও কমেনি।"
অফিসের নিচে চা খেতে খেতে চরম বিরক্তি নিয়ে কথাগুলো বলছিল শামিম। পাশে দাঁড়ানো তার ছোটবেলার বন্ধু সৌরভ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
-"কেনো? আঙ্কেল আবার কী করলেন?"

শামিম পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা বিদ্যুতের কাগজ বের করে সৌরভের সামনে ধরলো।
-"দেখ! পুরো দুনিয়া ডিজিটাল হয়ে গেছে। আমি চাইলে এক মিনিটে বিকাশ বা রকেটে কারেন্ট বিল দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু না! বাবার জেদ, তাকে ওই কাগজের বিল হাতে নিয়ে, এই কাঠফাটা রোদে হেঁটে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে বিল দিতে হবে! আমি আজ জোর করে বিলের কাগজটা উনার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বিকাশে পেমেন্ট করে দিয়েছি। বলেছি,
-'আর কোনোদিন বিল দিতে রোদে পুড়তে হবে না।'
অথচ এই কাজটা করার পর থেকে বাবা আমার সাথে কথা বলছেন না, সকালের নাস্তাও করেননি। তুই বল, আমি কি উনার ভালো চাইনি? মানুষ দেখলে কী বলবে, শামিম এত টাকা কামায়, আর ওর বুড়ো বাবা ব্যাংকের লাইনে ধাক্কা খায়?"

সৌরভ চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলো। সে শামিমের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

-"শামিম, তুই আসলে একটা গাধা।"
শামিম চমকে উঠলো।
-"মানে? আমি বাবার কষ্ট কমালাম, আর আমি গাধা?"

সৌরভ ধীর গলায় বলতে শুরু করলো,
-"আঙ্কেল রিটায়ার করেছেন পাঁচ বছর হলো। এই পাঁচ বছরে উনার রুটিনটা কী, তুই কখনো খেয়াল করেছিস? তুই সকালে অফিসে যাস, ভাবি তার নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে, বাচ্চাটা স্কুলে যায়। আঙ্কেল সারাটা দিন ওই চার দেয়ালের ভেতর একা একা কাটান। উনার করার মতো কোনো কাজ নেই। এই সংসারে উনি যে এখন আর কোনো কাজের না, এই অবসাদটা উনাকে কুড়ে কুড়ে খায়।

ওই কারেন্ট বিল, গ্যাস বিল এগুলোই হচ্ছে উনার বেঁচে থাকার একমাত্র দায়িত্ব। তুই কখনো সকাল দশটায় ব্যাংকের বিল দেওয়ার লাইনটা খেয়াল করেছিস? দেখবি ওই লাইনে কোনো ইয়াং ছেলেপেলে নেই। সব আমাদের বাবাদের বয়সী রিটায়ার্ড মানুষ। ওই লাইনটা আসলে বিল দেওয়ার জায়গা না রে শামিম, ওটা ওদের সোশ্যাল ক্লাব।"

শামিম ভ্রু কুঁচকে শুনছে। সৌরভ বলে চললো,
-"মাসে অন্তত ওই একটা দিন উনারা ইস্ত্রি করা শার্টটা গায়ে দিয়ে বের হন। লাইনে দাঁড়িয়ে সমবয়সী মানুষদের সাথে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করেন, কার জয়েন্টে কত ব্যথা সেটা নিয়ে আলোচনা করেন। বিল দেওয়া শেষ করে মোড়ের দোকানে বসে চা খান। এই পুরো প্রসেসটার মাধ্যমে উনারা নিজেদের বোঝান,
'আমি এখনো ফুরিয়ে যাইনি, সংসারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখনো আমাকেই করতে হয়।'

আর আজ তুই তোর ওই স্মার্টফোনের দুইটা বাটন চেপে তোর বাবার সেই শেষ দায়িত্বটুকুও কেড়ে নিলি। তুই উনার সময় বাঁচাসনি শামিম, তুই আজকে সকালে প্রমাণ করে দিয়েছিস যে তোর সংসার চালানোর জন্য এখন আর তোর বাবার কোনো প্রয়োজন নেই। তুই উনাকে পুরোপুরি অকেজো আর বাতিল প্রমাণ করে দিয়েছিস।"

শামিমের হাতের চায়ের কাপটা কাঁপতে লাগলো। তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। সে বুঝতে পারলো, প্রযুক্তির এই আধুনিকতা তার স্ট্যাটাস বাঁচালেও, তার বাবার একমাত্র সামাজিক জীবন আর আত্মসম্মানটুকু কেড়ে নিয়েছে।

সে চায়ের দামটা দ্রুত মিটিয়ে দিয়ে দৌড়ে নিজের বাইকের দিকে গেলো। সৌরভ পেছন থেকে ডাকলো,
-"কিরে, কোথায় যাস?"
শামিম বাইক স্টার্ট দিতে দিতে ভাঙা গলায় বললো,
-"বাসায় যাচ্ছি। প্রিন্টার থেকে একটা ফেক কারেন্ট বিল প্রিন্ট করে বাবার হাতে দিয়ে বলবো বাবা, বিকাশের সার্ভার ডাউন, টাকা আটকে গেছে। কাল সকালে ব্যাংকে গিয়ে বিলটা তোমাকেই দিয়ে আসতে হবে!"

(সমাপ্ত.....)

#অণুগল্প
#লাইন
#ইয়াছিরআরাফাতরামিম

Sort:  

Hi @yasirarafatramim

This post is detected as an AI Content by @abuse-watcher. Your steemit profile is under observation list.

Visit our Steemwatcher portal for watching plagiarism activities of abusers.
https://abuse-watcher.com/

Caught ByAbuse TypeDownvotePlag Src
@darkeyeAI ContentNolink
  1. Guidelines for Steemit Users
  2. Our Downvote Policy


Contact us on our discord server in appeal channel Discord Server