আমরা কি সত্যিই নক্ষত্রের ধূলিকণা? মানবদেহে লুকিয়ে থাকা মহাবিশ্বের গল্প
ছোটবেলা থেকে আমরা সবাই আকাশের তারা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। রাতের আকাশে অসংখ্য জ্বলজ্বলে নক্ষত্র দেখে কখনো না কখনো আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই বিশাল মহাবিশ্বের সাথে আমাদের সম্পর্কটা আসলে কী? আমরা কি শুধুই পৃথিবীর ক্ষুদ্র এক প্রাণী, নাকি আমাদের অস্তিত্বের শিকড় আরও গভীরে, আরও দূরে কোথাও লুকিয়ে আছে? বিজ্ঞানের উত্তরটি সত্যিই অবাক করার মতো। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি পরমাণুই একসময় কোনো না কোনো নক্ষত্রের অংশ ছিল। অর্থাৎ, আমরা শুধু পৃথিবীর সন্তান নই, আমরা পুরো মহাবিশ্বের সন্তান।
বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী Carl Sagan একবার বলেছিলেন,
We are made of star stuff.
অর্থাৎ, আমরা নক্ষত্রের উপাদান দিয়েই তৈরি।
এই কথাটি শুনতে যতটা কাব্যিক মনে হয়, এর পেছনের বৈজ্ঞানিক সত্য ততটাই বিস্ময়কর। প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি বিশাল ঘটনার মাধ্যমে মহাবিশ্বের জন্ম হয়, যাকে আমরা Big Bang নামে চিনি। মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকে মূলত শুধুমাত্র Hydrogen এবং Helium গঠিত হয়েছিল। তখন পৃথিবী ছিল না, সূর্য ছিল না, এমনকি Iron, Carbon, Gold বা Oxygen এর মতো উপাদানগুলোরও কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
কোটি কোটি বছর পরে মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা গ্যাস এবং ধূলিকণা একত্রিত হয়ে প্রথম নক্ষত্রগুলোর জন্ম দেয়। সেই নক্ষত্রগুলোর কেন্দ্রেই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য প্রক্রিয়া Nuclear Fusion। এই প্রক্রিয়ায় Hydrogen ধীরে ধীরে Helium এ পরিণত হয়, তারপর Carbon, Oxygen, Nitrogen এবং আরও ভারী উপাদান তৈরি হতে থাকে। অর্থাৎ, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ উপাদানই কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়েছে।
একসময় বিশাল নক্ষত্রগুলো তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং ভয়াবহ Supernova Explosion এর মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী যে, এতে তৈরি হওয়া উপাদানগুলো পুরো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই মহাজাগতিক ধূলিকণারই একটি ক্ষুদ্র অংশ থেকে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ, পৃথিবী এবং অবশেষে আমরা।
ভাবুন তো, আমাদের শরীরের প্রতিটি পরমাণুর ইতিহাস কয়েক হাজার বছর নয়, কয়েক বিলিয়ন বছরের! মানবদেহের প্রায় ৬৫ শতাংশই অক্সিজেন দ্বারা গঠিত। আমরা যে পানি পান করি, আমাদের রক্ত, কোষ সবকিছুতেই অক্সিজেন রয়েছে। আর এই অক্সিজেন কোনো একসময় কোটি কোটি বছর আগে কোনো বিশাল নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছিল। আবার আমাদের শরীরের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপাদান হলো Carbon। আমাদের DNA, চুল, ত্বক, পেশী সবকিছুই Carbon এর উপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীরা বলেন, Carbon মূলত Red Giant Stars এর মধ্যে তৈরি হয়। অর্থাৎ, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে মহাবিশ্বের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
এরপর আসে Hydrogen। এই উপাদানটি সবচেয়ে আশ্চর্যজনক, কারণ এটি মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন থেকেই বিদ্যমান। আমরা যে পানি পান করি, তার Hydrogen পরমাণুগুলোর বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর হতে পারে। অর্থাৎ, আপনার শরীরের কিছু পরমাণু মহাবিশ্বের জন্মের সাক্ষী!
আমাদের রক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো Iron। এই Iron ছাড়া আমাদের শরীর অক্সিজেন পরিবহন করতে পারত না। কিন্তু Iron এর গল্প আরও অবাক করার মতো। Iron সাধারণত বিশাল নক্ষত্রের শেষ জীবনে তৈরি হয়। একটি নক্ষত্র যখন Iron তৈরি করতে শুরু করে, তখন সেটি তার জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে সেই নক্ষত্র Supernova বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায় এবং Iron মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, আমাদের রক্তে থাকা Iron কোনো এক মৃত নক্ষত্রের শেষ উপহার।
আমাদের হাড় ও দাঁতের প্রধান উপাদান Calcium এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। একসময় কোনো নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া Calcium আজ আমাদের শরীরকে শক্তিশালী করে রেখেছে। এছাড়াও আমাদের শরীরে রয়েছে Sodium, Potassium, Magnesium, Phosphorus এবং Sulfur এর মতো বিভিন্ন উপাদান, যেগুলো স্নায়ুর কার্যক্রম, হৃদস্পন্দন, শক্তি উৎপাদন এবং কোষের বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো আমাদের শরীরে অতি সামান্য পরিমাণে Gold ও রয়েছে। হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগলেও এটি সত্য। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, Gold সাধারণ নক্ষত্রে তৈরি হয় না। বরং এটি তৈরি হয় অত্যন্ত বিরল এবং ভয়াবহ ঘটনায়, যেমন Neutron Star Collision।
যখন দুটি মৃত নিউট্রন নক্ষত্র পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন প্রচণ্ড শক্তির মাধ্যমে Gold, Platinum এর মতো ভারী উপাদান তৈরি হয়। অর্থাৎ, আমাদের শরীরের ক্ষুদ্র Gold পরমাণুগুলো হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাগুলোর একটির ফল। এখন যদি একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করি, তাহলে বিষয়টি আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। আমরা যখন রাতের আকাশে তারার দিকে তাকাই, তখন আসলে আমরা অপরিচিত কিছু দেখছি না। কারণ সেই তারাগুলোর মধ্যেই কোনো একসময় আমাদের অস্তিত্বের উপাদানগুলো তৈরি হয়েছিল।
আমাদের শরীরের Carbon, Oxygen, Iron, Calcium সবকিছুই একসময় নক্ষত্রের অংশ ছিল। অর্থাৎ, আমরা এবং তারা দুজনেই একই মহাজাগতিক পরিবারের সদস্য। এই চিন্তাটি মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়। কারণ আমরা যতই নিজেদের বড় ভাবি না কেন, আমাদের অস্তিত্বের সূচনা হয়েছে মহাবিশ্বের বিশাল ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ থেকে। আমরা পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল বহু দূরে, কোনো এক Nebula-তে, কোনো এক জ্বলন্ত নক্ষত্রের ভেতরে।
হয়তো সেই কারণেই রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমাদের এত ভালো লাগে। হয়তো আমাদের ভেতরের পরমাণুগুলো তাদের প্রাচীন বাড়িকে চিনতে পারে। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, আমরা শুধুমাত্র মাটি, রক্ত আর মাংসের তৈরি কোনো সাধারণ প্রাণী নই। আমরা এমন এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, যার শরীরে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক ইতিহাস।
আমাদের হাড়ে আছে মৃত নক্ষত্রের Calcium, আমাদের রক্তে আছে সুপারনোভার Iron, আমাদের শরীরে আছে মহাবিশ্বের জন্মলগ্নের Hydrogen। তাই যখন পরবর্তীবার রাতের আকাশের দিকে তাকাবেন, তখন মনে রাখবেন, আপনি শুধু তারাগুলোকে দেখছেন না; আপনি আপনার নিজের অতীতকে দেখছেন।
কারণ সত্যিই,
আমরা নক্ষত্রের ধূলিকণা।
আমরা মহাবিশ্বেরই এক ক্ষুদ্র অংশ।
আমি আল সারজিল ইসলাম সিয়াম। আমি বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। আমি বর্তমানে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিএসসি-র ছাত্র। আমি স্বতন্ত্র স্বাধীনতা সমর্থন করি। আমি বই পড়তে এবং কবিতা লিখতে পছন্দ করি। আমি নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং অন্যের মতামত মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমি অনেক ভ্রমণ পছন্দ করি। আমি আমার অতিরিক্ত সময় ভ্রমণ করি এবং নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে ভালোবাসি। নতুন মানুষের সংস্কৃতি এবং তাদের জীবন চলার যে ধরন সেটি পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসি। আমি সব সময় নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে যখনই কোনো কিছু নতুন কিছু দেখতে পাই সেটার উপরে আকর্ষণটি আমার বেশি থাকে।
বিষয়: আমরা কি সত্যিই নক্ষত্রের ধূলিকণা? মানবদেহে লুকিয়ে থাকা মহাবিশ্বের গল্প
কমিউনিটি : সাহিত্য ক্যানভাস
আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাই এই কমিউনিটির সকল সদস্য কে, ধন্যবাদ...





High-Yield Curation by @steem-seven
Your content has been supported!
Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn high rewards
Click here to see our Tiered Reward System
We are the hope!