মহাবিশ্বের শেষ কোথায়?
রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই কখনো না কখনো ভেবেছি, এই মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেই পৃথিবী কি সত্যিই এত বড়, নাকি এটি বিশাল কোনো কিছুর ক্ষুদ্র একটি অংশ? বিজ্ঞান যতই এগিয়েছে, ততই মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে নতুন নতুন রহস্য। আজ আমরা জানি, পৃথিবী আমাদের কাছে যত বড়ই মনে হোক না কেন, মহাবিশ্বের তুলনায় এটি একটি ধূলিকণার চেয়েও ছোট। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি মহাবিশ্বের কোনো শেষ আছে কি না।
প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়, যাকে আমরা Big Bang নামে চিনি। এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। এই ঘটনার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় সময়, স্থান, শক্তি এবং পদার্থ। অর্থাৎ, আমাদের পরিচিত সবকিছুর শুরু সেখান থেকেই। বিগ ব্যাংয়ের পর ধীরে ধীরে তৈরি হয় প্রথম গ্যাসের মেঘ, যেগুলোকে আমরা Nebula বলি। কোটি কোটি বছর ধরে সেই গ্যাসের মেঘ থেকে জন্ম নেয় অসংখ্য নক্ষত্র। নক্ষত্রগুলোকে ঘিরে তৈরি হয় গ্রহ, উপগ্রহ এবং সম্পূর্ণ সৌরজগৎ। আমাদের সূর্যও ঠিক এমনভাবেই জন্ম নিয়েছিল প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে।
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেটি সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কিন্তু সূর্যও স্থির নয়। এটি আবার Milky Way Galaxy এর কেন্দ্রকে ঘিরে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২২০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। তবুও মিল্কিওয়ের একটি পূর্ণ চক্কর দিতে সূর্যের সময় লাগে প্রায় ২৩ কোটি বছর। অর্থাৎ, ডাইনোসরের সময় থেকে আজ পর্যন্ত সূর্য গ্যালাক্সির মাত্র একবারের একটু বেশি চক্কর সম্পন্ন করেছে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। আর বিজ্ঞানীদের ধারণা, দৃশ্যমান মহাবিশ্বে এমন গ্যালাক্সির সংখ্যা প্রায় ২০০ বিলিয়ন বা তারও বেশি হতে পারে। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে আবার কোটি কোটি নক্ষত্র। সংখ্যাটি এত বিশাল যে মানুষের কল্পনায় তা সম্পূর্ণভাবে ধরা কঠিন।
যদি পৃথিবীকে একটি বালুকণার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সূর্য হবে একটি ছোট বলের মতো। আর পুরো সৌরজগৎ হবে একটি বিশাল মাঠের সমান। কিন্তু সেই বিশাল মাঠটিও মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির তুলনায় প্রায় অদৃশ্য। আবার মিল্কিওয়ে নিজেই মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্যালাক্সির মধ্যে মাত্র একটি। এখন প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। আমরা শুধু Observable Universe, অর্থাৎ দৃশ্যমান মহাবিশ্ব পর্যন্ত দেখতে পারি। এর ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। কিন্তু এর মানে এই নয় যে মহাবিশ্বের আকার এতটুকুই। এর বাইরেও কী আছে, তা আমরা এখনো জানি না। হয়তো আরও অসংখ্য গ্যালাক্সি, আরও অজানা জগত, কিংবা এমন কিছু যা আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের ধারণাকেও বদলে দিতে পারে।
আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, মহাবিশ্বের সবকিছু আমরা দেখতে পাই না। বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা যে নক্ষত্র, গ্রহ এবং গ্যালাক্সি দেখি, সেগুলো পুরো মহাবিশ্বের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ গঠিত হয়েছে Dark Matter এবং Dark Energy দিয়ে, যেগুলোর প্রকৃতি এখনো রহস্যে ঘেরা। ভাবুন তো, আমরা যে মহাবিশ্বকে এত বিশাল মনে করি, তার অধিকাংশ অংশ সম্পর্কেই আমাদের জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিদিন রাতের আকাশে যে তারাগুলো আমরা দেখি, তাদের অনেকের আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে বছর, শতাব্দী, এমনকি হাজার হাজার বছর সময় নিয়েছে। অর্থাৎ, আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন আসলে বর্তমান নয়, অতীতকে দেখছি। কোনো নক্ষত্র হয়তো অনেক আগেই নিভে গেছে, কিন্তু তার আলো এখনো আমাদের চোখে এসে পৌঁছাচ্ছে। মহাবিশ্ব শুধু বড় নয়, এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিতও হচ্ছে। ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী Edwin Hubble আবিষ্কার করেন, দূরের গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব স্থির নয়; এটি প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে। এমনকি বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই প্রসারণের গতি সময়ের সাথে আরও বেড়ে চলেছে।
এই বিশাল মহাবিশ্বে পৃথিবী আমাদের একমাত্র পরিচিত বাসস্থান। এখানেই জন্ম, জীবন, ভালোবাসা, স্বপ্ন এবং সভ্যতার গল্প। কিন্তু মহাবিশ্বের বিশালতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় আমরা যতই নিজেদের বড় ভাবি না কেন, প্রকৃতির তুলনায় আমরা সত্যিই খুব ক্ষুদ্র। তবে এই ক্ষুদ্রতাই আমাদের দুর্বলতা নয়; বরং এটাই আমাদের সৌন্দর্য। কারণ এই ক্ষুদ্র পৃথিবীতেই এমন একটি প্রাণীর জন্ম হয়েছে, যে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, নক্ষত্রের জন্ম বুঝতে পারে, মহাবিশ্বের বয়স হিসাব করতে পারে এবং কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সির ছবি তুলতে পারে।
হয়তো একদিন মানুষ আরও দূরে যাবে। হয়তো নতুন নতুন গ্রহে বসতি গড়বে। হয়তো একদিন আমরা মহাবিশ্বের আরও বড় রহস্য উন্মোচন করব। কিন্তু আজও একটি প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে, এই মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? নাকি এর কোনো শেষই নেই? সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মানুষ যুগের পর যুগ গবেষণা করে যাবে। আর এটাই বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর দিক প্রতিটি উত্তর নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই পরেরবার যখন রাতের আকাশে অসংখ্য তারা দেখবেন, তখন শুধু সুন্দর দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং ভাবুন, আপনি এমন এক মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে আছেন, যার ইতিহাস প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের, যার রহস্যের অধিকাংশই এখনো অজানা, আর যার ভেতরে আমাদের পৃথিবী কেবল একটি ক্ষুদ্র নীল বিন্দু। হয়তো আমরা মহাবিশ্বকে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত মহাবিশ্ব সম্পর্কে যত বেশি জানি, তত বেশি উপলব্ধি করি, জানার এখনও কত কিছু বাকি।
আমি আল সারজিল ইসলাম সিয়াম। আমি বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। আমি বর্তমানে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিএসসি-র ছাত্র। আমি স্বতন্ত্র স্বাধীনতা সমর্থন করি। আমি বই পড়তে এবং কবিতা লিখতে পছন্দ করি। আমি নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং অন্যের মতামত মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমি অনেক ভ্রমণ পছন্দ করি। আমি আমার অতিরিক্ত সময় ভ্রমণ করি এবং নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে ভালোবাসি। নতুন মানুষের সংস্কৃতি এবং তাদের জীবন চলার যে ধরন সেটি পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসি। আমি সব সময় নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে যখনই কোনো কিছু নতুন কিছু দেখতে পাই সেটার উপরে আকর্ষণটি আমার বেশি থাকে।
বিষয়: মহাবিশ্বের শেষ কোথায়?
কমিউনিটি : সাহিত্য ক্যানভাস
আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাই এই কমিউনিটির সকল সদস্য কে, ধন্যবাদ...




High-Yield Curation by @steem-seven
Your content has been supported!
Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn high rewards
Click here to see our Tiered Reward System
We are the hope!
আপনার দেওয়া তথ্য থেকে আমি এই বুঝতে পেরেছি যে ব
Estos temas van a definir los próximos años y está bueno que se discutan sin caer en opiniones vacías.