দ্বিচারিতা!

মুহূর্তগুলো বেজায় দামী;
এই সময়, যদিও আমি বেনামী!
চোখের সামনে ধুঁকছে মনুষত্ব;
নির্লজ্জের মতো বাড়িয়ে হস্ত!
সবটাই লুটে পুটে নিতে ব্যস্ত
সুযোগ, সুবিধা,পারলে গোটা শহর,
তাই হয়তো, অস্তাচলে সংগ্রামী।
এ, কেমন শিক্ষা? এ কেমন সংস্কৃতি?
এ, যেনো এক্ নিরাময় বিহীন অসুখ,
অসুস্থ্য মানসিক বিকৃতি!
যেথায় হাত পাততে নেইকো লজ্জা,
পরিপাটি দেহ, সুখকর শয্যা!
সবটা পেয়েও লোভের নাইকো শেষ;
অভাবী মানুষের পাতের খাবার
গোগ্রাসে দেখছি খাচ্ছে বসে বেশ!
প্লাস্টিকে মোড়া চালের নিচে,
জল আটকাবার চেষ্টা করে মিছে;
ছেঁড়া পোশাক, ছেঁড়া চাদরে
আবৃত যেখানে দেহ;
তাদের সাথে নিজেদের অবস্থান
তুলনা কি করে কেহ?
একমুঠো ভাত জোগাতে
হিমসিম খায় রোজ;
আরেকপক্ষ হাত পাতে,
করতে মহাভোজ!
ঈশ্বর সেবা হয়কি, এই অভিনয় দিয়ে?
অভাবীর পাওনায় থাবা বসিয়ে
একজনের হকের দাবী কেড়ে নিয়ে?
ধিক্কার সেই সুস্থ্য দেহে, সেই শিক্ষায়;
যেখানে পরিশ্রমের পরিবর্তে ভরসা করে,
অন্যের ভাত মেরে, শুধু ভিক্ষায়!
নিন্দা করে প্রশাসন নিয়ে;
নিজেদের বিবেক বিকিয়ে দিয়ে!
দেখছি সবই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে;
নিজের শিক্ষায় অটুট রয়ে!
আমার সবটা জানাই তাকে,
দেখি তিনি সাড়া দেন, কবে কার ডাকে।
আচার বিধি সবটা বেকার,
নৈতিকতা, যেখানে ধুয়ে মুছে একাকার!
নেন কি পুজো সৃষ্টিকর্তা সেই হাতে?
ঘুষের টাকার নিবেদন যেই পাতে?
অর্থ দিয়ে পাপ যায়না ঢাকা,
লোভ যেথা প্রাধান্য পায়,
বিবেক বুদ্ধি ফাঁকা!
ভরেছে পাপের ঘড়া..
সবটাই আজ উন্মুক্ত,
যায়নি শত প্রয়াসে ঢেকে রাখা।
সময় আসলে সবটা যায় চলে;
আজকের সময় দিচ্ছে সেটাই বলে!
এটাই তো সৃষ্টিকর্তার বিচার,
নেই তিনি সেখানে, যেখানে মিথ্যাচার।
আমি সারাদিন তার সাথে কথা বলি;
তার দিক নির্দেশনায়, এখন কেবল চলি!
একটুও গ্লানি কাজ করে না মনে;
কারণ, দ্বিচারিতা চলেনা,
কখনই মনের সংগোপনে!

আজকে একটি কবিতা আপনাদের মাঝে তুলে ধরলাম, যেখানে কেবলমাত্র নিজের অভিব্যক্তি নয়, রয়েছে কিছু প্রশ্ন!
যেগুলো নিজেদের সুবিধার খেরোখাতা ভরতে গিয়ে আজকাল নিজেদের কাছে, নিজেরা কেউ আর বিশেষ করে না!
নাহ্! সময় নেই, এমনটা নয়, আসলে ঐ যারা ভাবের ঘোরে চুরি করে থাকে, তারা জানে তাদের কাছে এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর নেই!
গতকাল, সবে ভাত খেয়ে এঁটো থালাটা ধুতে গেছি রান্না ঘরের বেসিনে, ঠিক সেই মুহুর্তে দরজায় বেল বাজানোর শব্দ কানে আসলো!
প্রথমটায় ভেবেছিলাম জলের ছেলেটি বোধহয় জল দিতে এসেছে। আচ্ছা, এখানে জানিয়ে রাখি আমি সপ্তাহে তিনদিন সামনের গেট খুলি, আর বাকিদিন বন্ধ রাখি।
একলা থাকি, এটা খানিক সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই করে থাকি, তাই বলে যে দিনগুলোয় গেট খুলে রাখি, সে দিনগুলোয় কি বিপদ আসবে না?
হ্যাঁ! আসতেই পারে, তবে সবদিন গেট বন্ধ রাখলে মনে হয় কয়েদে বসবাস করছি, তাছাড়া মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনিবার দরজার বাইরে টাও মুছি, তাই গেট খুলতেই হয়।
যাক, যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম, গতকাল ছিল বুধবার, কাজেই আমার গ্রিল বন্ধ ছিল, তাই বেল বাজার শব্দ শুনে, তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে চাবি নিয়ে গ্রিল খুলতে উদ্ধত হতেই স্তম্ভিত হলাম!
একজন বৃদ্ধ লোক, পরনে অশৌচ বস্ত্র! বুঝলাম, নিকট কাউকে সদ্য হারিয়েছেন।
আমার কাছে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন, নিজের সাধ্য অনুযায়ী গেটের মধ্যে থেকে সেটি হস্তান্তর করবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে লোকটি বললেন,
মেয়ে না খেয়ে রয়েছে!
আমার বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠলো!
আমি একা, আর ভাত সেটাও রান্না করি একবেলার মত, একার জন্য।
আমি একবেলা খাই, তাই সেটা দুপুরে শেষ করে, বাসন মাজতেই ব্যস্ত ছিলাম।
কি ভীষণ লজ্জা! সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকেই উপায় বেরিয়ে আসলো, আমি বললাম, আমি আপনাকে চাল দিতে পারি।
উনি বললেন, তাই দাও মা একটা প্লাস্টিকে করে!
আমি সেইমত ওনাকে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চাল দিয়ে, পুনরায় বাসন ধুতে ধুতে ভাবলাম, কি আশ্চর্য ব্যাপার! সবেমাত্র খাওয়া শেষ, এই চাওয়া যদি আর মিনিট দশেক আগে হতো?
তাহলে তো ওনাকে আমি আমার ভাত দিতেই পারতাম, তাই না?
আমি নয়তো আবার রান্না করে নিতাম! এখানেই আমাকে ঈশ্বর শেখালেন, দেওয়ার সদিচ্ছা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, কি দিচ্ছি, কিভাবে দিচ্ছি তার থেকেও!
তেমনি নেওয়ার ক্ষেত্রেও নিজের প্রয়োজন বুঝে গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।
দেখুন, আমি ধর্মীয় আচার, রীতিনীতি মেনে পুজো করতে পারি না বটে, কিন্তু আমার মধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে অন্যের হক মেরে তুষ্ট করবার না আছে ইচ্ছে, আর সে প্রয়াস আমি করিও না।
কারণ কি জানেন? শ্রী কৃষ্ণ গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় এবং ৪৭ নম্বর শ্লোকে বলে গিয়েছেন,
কর্ম্মণেবাধিকারস্তে মা ফালেষু কদাচন।
আমি তাই দ্বিচারিতা বিহীন কর্ম ঈশ্বরকে নিবেদন করতে চাই, ফলাফলের প্রত্যাশা না করে।
কি লাভ বলুন তো, অন্যের হক মেরে? হজম যে হয়না সেই অর্থ এ বিষয়টি একাধিকবার প্রমাণিত।
এরপর, কিছু অঘটন ঘটলে নিজেদের ভুলভ্রান্তি চোখেই পড়বে না! এগুলো সবটাই আমার কাছে দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়;
দুঃখিত! এই ভাবের ঘোরে চুরিকে আমি ভক্তি আখ্যা দিতে নারাজ!
আমার মনে হয়না, ঈশ্বরও এদের নিবেদন গ্রহণ করেন! তাই যদি হতো, এতো বড় বড় মন্দির তৈরি করবার পরে গারদে যেতে হতো না!
আজকেই বিশ্বাস ভাইদের একজন গারদের আড়ালে, এটা কি লজ্জা নয়? থাকলো মানসম্মান? এতদিনের উপার্জন রক্ষা করতে পারলো? তাই কথায় আছে, শেষ ভালো যার, সব ভালো! সেই প্রয়াস করাই শ্রেয়।


