"সিকিম ডায়েরি: জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর যাত্রাপথের গল্প"

in Incredible India2 days ago (edited)
IMG_20260510_090356.jpg
"জিরো পয়েন্টে যাওয়ার সময় মেঘের রাজ্যে প্রবেশের মুহূর্ত।"

Hello,

Everyone,

অনেকদিন বাদে আজ আবারও আপনাদের সাথে সিকিম ভ্রমণের আরও একটি পর্ব নিয়ে হাজির হলাম। সিকিম ভ্রমণের গত পর্বে আপনাদের সাথে শেয়ার করেছিলাম "লাচুং গ্ৰামে‌ রেস্টুরেন্টে বসে পাহাড়ি মোমো উপভোগ করার সুন্দর মুহূর্ত" র গল্প।

যেখানে একেবারে শেষে আপনাদের জানিয়েছিলাম পরদিন সকালে আমাদের প্ল্যান ছিলো জিরো পয়েন্টে যাওয়ার। তাই বলাই বাহুল্য আজকের পর্বে উপস্থাপন করবো জিরো পয়েন্টে যাওয়ার মুহূর্ত এবং অনুভূতি।

লাচুং গ্রাম থেকে জিরো পয়েন্টে যেতে মোটামুটি আড়াই থেকে তিন ঘন্টা সময় লাগবে, এমনটাই জানিয়ে ছিলেন আমাদের ড্রাইভার দাদা। তিনি বলেছিলেন খুব সকালেই আমাদেরকে জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। লাচং গ্রামে রাতে কেমন ঠান্ডা ছিলো, সেটা আগের পর্বেই আপনাদেরকে জানিয়েছিলাম।

IMG_20260606_202351.jpg
"জিরো পয়েন্টে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হোমস্টে থেকে বেরোনোর আগের মুহূর্তের ছবি"

কিন্তু যেহেতু ঘুরতে গিয়েছি, তাই শীতকে ভয় পেলে চলবে না। আমি এবং আমার বান্ধবী রাখি দুজনেই ভীষণ শীতকাতুরে। কিন্তু তবুও জিরো পয়েন্ট দেখার উৎসাহে শীত যেন অনুভূত হচ্ছিলো না। সকাল বেলাতে সকলেই উঠে পড়েছিলাম এবং এক এক করে ফ্রেশ হয়ে, একেবারে স্নান সেরে নিয়েছিলাম।

সকালের দিকে যতই ঠান্ডা লাগুক না কেন, একবার স্নান করা হয়ে গেলে সম্পূর্ণ দিনের জন্য নিশ্চিত। তাই প্রত্যেক দিনই হোটেল থেকে বেরোনোর আগে আমরা স্নানপর্ব সেরে নিতাম। আমাদের বেরোনোর সময় ছিলো সকাল সাড়ে আটটা।

IMG_20260510_084321.jpg
"হোম স্টের সামনে দাঁড়িয়ে দূরে বরফে মোড়া পাহাড়ের চূড়ায় বার বার চোখ যাচ্ছিলো"

তাই সকলে তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে, সাড়ে আটটার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছিলাম। সকলে মিলে তৈরি হয়ে গাড়ির জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করার সময় দূরের পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফের দিকে চোখ পরলো। ওই বরফের কাছাকাছি পৌঁছানো ছিলো আমাদের উদ্দেশ্য। এটা ভাবতেই যেন এক অন্যরকম অনুভূতিতে ভরে উঠছিল মনটা।

IMG_20260510_084338.jpg
"জিরো পয়েন্টে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে তোলা ছবি"

কিছুক্ষণের মধ্যে ড্রাইভার দাদাও চলে এলেন এবং আমরা সকলে গাড়িতে উঠে রওনা করলাম। জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে বেশ খানিকটা যাওয়ার পরেই রাস্তা দেখে বোঝা গেলো, এই রাস্তাতেও ধ্বস নেমেছিলো। নর্থ সিকিমের রাস্তায় চলাচল করাটা যে এতো ভয়ের, সেটা বোধহয় সেখানে উপস্থিত না হলে অনুভব করা সম্ভব নয়।

IMG_20260510_084727.jpg
"জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর আগে এই জায়গায় পারমিট জমা করতে হয়।"

গাড়ি কিছুদূর এগোনের পরে একটা জায়গায় পারমিট এর জন্য দাঁড়িয়েছিল। সব গাড়ি সেখানে দাঁড়ায় এবং পারমিট জমা দিয়ে তারপর এগোতে হয়। আমাদের ড্রাইভার দাদাও দাঁড়িয়ে ছিলেন।

IMG_20260510_084909.jpg
"বাইক নিয়ে পাহাড়ে ঘোরার আনন্দ নিশ্চয়ই অন্যরকম।"

ঠিক তখনই পাশে চোখ পড়তেই দেখলাম বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ে বাইক নিয়ে পাহাড় ভ্রমণে এসেছে। এই জার্নিটা নিশ্চয়ই আরও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। তবে সত্যি কথা বলতে বাইকে উঠতে আমার ব্যক্তিগতভাবে ভয় লাগে। আর নর্থ সিকিমের রাস্তায় তো কোনো প্রশ্নই আসে না।

IMG_20260606_204258.jpg
IMG_20260606_204239.jpg
IMG_20260510_090125.jpg
IMG_20260510_085133.jpg
নর্থ সিকিমের যে রাস্তা‌ তার কিছু কিছু জায়গায় ধ্বসের কারনে অবস্থা সত্যিই ভয়াবহ। এই সময় আমার সত্যিই ভয় করছিলো।

এরপর আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করলো। রাস্তায় যে কত বার এমন ধ্বসের সম্মুখীন হয়েছিলাম তা বলে বোঝাতে পারবো না। একটা জায়গার অবস্থা তো আরো ভয়ঙ্কর। কারণ সেখান থেকে রীতিমতো ঝর্ণার জল রাস্তার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো। আশাকরি ছবি দেখে কিছুটা হলেও আপনারা অনুভব করতে পারছেন।

তবে একদিকে যেমন এই পাহাড়ী রাস্তায় চলার ভয় ছিলো, ঠিক তেমনি বরফের চূড়াগুলো যখন একটু বেশি দেখা যাচ্ছিলো অর্থাৎ আমরা বরফের কাছাকাছি যাচ্ছিলাম, ততই যেন এক অন্যরকমের উত্তেজনায় মন ভরে উঠছিলো।

IMG_20260510_085556.jpg
IMG_20260510_085613.jpg
"বিস্‌ বাহাদুর মিলিটারি ক্যাম্প"

আরও কিছুটা যাওয়ার পর বিস্ বাহাদুর নামক একটা ক্যাম্প চোখে পড়লো। এটা মূলত আর্মিদের ক্যাম্প। জিরো পয়েন্টে ডিউটিরত সকল আর্মিরা বোধহয় এখানেই থাকেন। সমস্ত জায়গাটা খুবই সুন্দরভাবে সাজানো। বিশেষ করে পাথরগুলোতে এতো সুন্দর আলাদা আলাদা রং করেছে, যা গাড়ি থেকে দেখতে ভীষণ আকর্ষণীয় লাগছিলো। এই ক্যাম্পের ভিতরে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ, তাই গাড়ি থেকে দুটি ছবি তোলার চেষ্টা করলাম।

IMG_20260606_205814.jpg
IMG_20260606_205759.jpg
"আমাদের পাশাপাশি আরও বহু পর্যটক সারিবদ্ধ ভাবে জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে চলছিলো"

ধীরে ধীরে গাড়ি এবার উপরের দিকে উঠতে শুরু করলো। আমাদের আগে যে সকল গাড়ি রওনা দিয়েছিলো তাদেরকে দেখতে পেলাম উপরের দিকে উঠছে। ওই পথ অনুসরণ করে আমাদেরকেও উঠতে হবে। তবে কিছুটা দূর এগোনোর পরেই এইরকম ধ্বসের চিত্র দেখে মনের ভিতরে ভয়ও লাগছিলো।

IMG_20260606_210336.jpg
IMG_20260510_090406.jpg
"এমন‌‌ দৃশ্য সামনাসামনি দেখবো কখনো আশাই করিনি।"

তবে সেদিন তেমন মেঘলা ওয়েদার ছিলো না। সকাল থেকেই পরিষ্কার আকাশ ছিলো। বেশ কিছুটা এগোতে যেন একেবারে মেঘেদের কাছাকাছি চলে এলাম। আর দুপাশ জুড়ে দেখা যাচ্ছিলো প্রচুর রডোডেনড্রন গাছ।

এইরকম ভাবেই বেশ কিছুটা পথ চলার পর একটা দোকানে আমাদের গাড়ি থামলো। যেখান থেকে আমাদের বরফে পড়ার উপযুক্ত জুতো নিতে হবে। তাই নিজেদের জুতোগুলো সেখানে জমা দিয়ে, সেখান থেকে প্রত্যেকের পায়ের মাপের জুতো পড়ে নিলাম।

IMG_20260606_210532.jpg
IMG_20260606_210546.jpg
"পাহাড়ে সাক্ষাৎ হলো‌ সিজুকার সাথে, যাকে দেখে পিকলুকে মিস করছিলাম।

পেছনদিকে চোখ পড়তেই আমি থমকে গেলাম। যেন মনে হল পিকলু আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার পুরনো পোস্ট যারা পড়েছেন, তারা জানেন আমার পোষ্য পিকলুর কথা। দেখুন আপনাদেরও ওকে দেখে একই রকম মনে হবে।

তিনিও আমাদের মতন জিরো পয়েন্টে যাচ্ছেন ঘুরতে তার পরিবারের সাথে। পরিবারের আদরের শিজুকা হলেন তিনি। ড্রেসটাও পড়েছে ভীষণ কিউট। মোট কথা তাকে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারলাম না। তাই এগিয়ে গেলাম পরিচয় করতে। সামনে গিয়ে দাড়াতেই তিনি এগিয়ে এলেন আমার দিকে। যেন তিনিও পরিচয় পর্বই সারতে চাইছেন।

IMG_20260606_211250.jpg
"আমার‌ আদরের পোষ্য পিকলু। দেখতে কিছুটা সিজুকার মতোই"

কিছুক্ষণ তার সাথে সময় কাটিয়ে, ছবি তোলার জন্য ফোনটা তার দিকে ধরতেই একেবারে ক্যামেরার দিকে মহারানী তাকিয়ে ছিলেন। ছবিটা দেখে আশাকরি আপনারাও বুঝতে পারবেন। যাইহোক এক মুহূর্তের জন্য মনটা যেন ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। পিকলুকে ভীষণভাবে মিস করছিলাম। তবে মুহূর্ত থেমে থাকার নয়, তাই আবার সকলে মিলে সমান উদ্যোগে রওনা করলাম গাড়িতে উঠে।

IMG_20260606_212404.jpg
IMG_20260606_212350.jpg
"ধ্বসের চিহ্ন দেখে ভয় লাগলেও, বরফে ঢাকা পাহাড় দেখতে অসাধারণ লাগছিলো"

ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ি উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। আমরা জিরো পয়েন্টের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমাদের আগের গাড়িগুলো সামনে সারিবদ্ধ ভাবে চলছিলো। সেই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তার সম্পূর্ণটা বোধহয় লেখা বা ছবির মাধ্যমে আপনাদের সাথে শেয়ার করা সম্ভব নয়।

সেখান থেকে মিনিট দশকের মধ্যে আমরা জিরো পয়েন্টের মূল জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তগুলো না হয় পরবর্তী পর্বের জন্যই তোলা থাক। আপাতত জিরো পয়েন্টের যাত্রাপথের গল্প আপনাদের কেমন লাগলো, অবশ্যই মন্তব্যের মাধ্যমে জানাবেন।

ভালো থাকবেন সকলে। শুভরাত্রি।

Sort:  
image.png
Curated By: lirvic
Loading...