'ফাইজলামি’র আড়ালে যখন বিষ ছড়ায়: অপমানকে ‘মজা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার কদর্য সংস্কৃতি
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
আমাকে প্রায়শই শুনতে হতো, 'তোর কি চেহারা আর ভালো হবে না?' কিংবা 'তোর তো ওজন কমেছে, কোনো ব্যারাম ধরল নাকি?'। আমি যখন কষ্ট পেতাম, আমার চোখমুখ যখন কালো হয়ে যেত, তখন তারা হোহো করে হেসে বলত, 'আরে সিরিয়াস হচ্ছিস কেন? জাস্ট কিডিং!'। এই 'জাস্ট কিডিং' বা 'ফান' শব্দটা আসলে এক বিশাল বড় ঢাল, যার নিচে লুকানো থাকে হীনম্মন্যতা আর অশিক্ষা। কারো শরীর, তার রঙ, তার পোশাক, বা তার পারিবারিক অবস্থা নিয়ে তামাশা করা কখনোই কৌতুক হতে পারে না। আমি শিখেছি, কৌতুক সেটাই, যেখানে হাসার পাত্র আপনি নিজেও হতে পারেন, কিন্তু অন্যকে কাদানো কখনও কৌতুক নয়।
এই অপমানগুলোকে যখন ‘কুল’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল ভুক্তভোগীর ওপরই প্রভাব ফেলে না, বরং পুরো সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজায়। আমার এখনও মনে আছে, একবার এক গেট-টুগেদারে আমার এক বন্ধু আমার অতীতের একটা কষ্টের ঘটনা নিয়ে সবার সামনে উপহাস করে। সবাই হাসছিল, আর আমি তখন মাটি ফেটে ঢুকে যেতে চাচ্ছিলাম। অথচ, তাদের কাছে সেটাই ছিল 'আড্ডার প্রাণ'। এ ধরণের ঘটনা আমার আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি গুড়িয়ে দেয়। আমি সবার সামনে যেতে ভয় পেতাম, ভাবতাম কখন আবার কে আমাকে নিয়ে তামাশা করবে। এই যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার দায়ভার কে নেবে? এই 'কুল' পাবলিকরা? তারা তো কেবল মজা লুটতে জানে, অন্য কারো বেদনার গভীরতা মাপার মত হৃদয় তাদের নেই।
অনেক সময় আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না। কারণ, প্রতিবাদ করলে উত্তর আসে, 'তুই তো একদম চাইল্ডিশ!' বা 'তোর কোনো হিউমার সেন্স নেই'। এভাবেই অপরাধবোধটা উল্টো আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ, আমি দেখেছি, যারা সবচেয়ে বেশি এসব ‘ফান’ করে, তারা নিজেদের ওপর আসা সামান্যতম সমালোচনাও সহ্য করতে পারে না। তাদের অহংকার তখন আঘাত পায়। আমি যখন সাহস করে একবার প্রতিবাদ করলাম, তখন আমি পুরো আড্ডা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। তারা বলল, আমি নাকি 'আড্ডার পরিবেশ নষ্ট' করে দিয়েছি। কিন্তু কেউ বুঝল না, যে পরিবেশ অন্য কারো সম্মানের বিনিময়ে তৈরি হয়, তা আসলে বিষাক্ত। সেই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে সরে আসাই নিজের জন্য ভালো।
অপমানকে 'মজা' বা 'ফান' বলে চালিয়ে দেওয়া এটা একটা সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছি যে, আমরা আর মানুষের যন্ত্রণা আর আনন্দের পার্থক্য বুঝতে পারছি না। আমার কাছে এখন মনে হয়, যারা এভাবে কাউকে অপমান করে নিজেকে 'কুল' মনে করে, তারা আসলে নিজেদের জীবনে কোনো বড় কিছু অর্জন করতে পারেনি, তাই অন্যকে ছোট করে নিজেদের বড় দেখানোর চেষ্টা করে। তারা নিজেদের শূন্যতা ঢাকতে অন্যের ওপর তীর ছোড়ে। তাদের এই 'কুলনেস' আসলে এক ধরণের ভণ্ডামি, এক ধরণের মানসিক অসুস্থতা।
পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, যারা এই লেখা পড়ছ এবং তোমাদের জীবনেও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে, দয়া করে চুপ থেকো না। নিজের সম্মানের চেয়ে বড় কিছু নেই। এই 'কুল' সমাজের স্বীকৃতি তোমার প্রয়োজন নেই, যদি তা তোমার নিজের ওপর অশ্রদ্ধার বিনিময়ে আসে। আর যারা এই ‘ফাইজলামি’কে ‘কুল’ মনে করো, একদিন হয়তো তুমিও কারো ‘ফানের’ পাত্র হবে, সেদিন বুঝবে—অপমানের ভার কত ভারী হয়। মানুষের হৃদয় কাঁচের চেয়েও বেশি ভঙ্গুর; তা নিয়ে খেলতে যেও না। যা তুমি সইতে পারবে না, তা অন্য কারো ওপর চাপিয়ে দিও না। 'কুল' হতে গিয়ে মানুষ থেকে অমানুষ হয়ে যেও না।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


Thank you for sharing on steem! I'm witness fuli, and I've given you a free upvote. If you'd like to support me, please consider voting at https://steemitwallet.com/~witnesses 🌟