মহাজাগতিক অন্ধকার: ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির অন্তহীন রহস্য

in আমার বাংলা ব্লগ22 hours ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




Gemini_Generated_Image_9utfi89utfi89utf.png

মহাবিশ্বের বিশালতা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। রাতের আকাশে আমরা যে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র, গ্রহ এবং নীহারিকা দেখি, তা আসলে পুরো মহাবিশ্বের মাত্র একটি সামান্য অংশ। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ গবেষণার এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর সত্য হলো, আমরা যা কিছু দেখি বা যা কিছু আমরা সাধারণ পদার্থ হিসেবে জানি, তা মহাবিশ্বের মোট ভরের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশই হলো এমন কিছু যা আমরা দেখতে পাই না, ছুঁতে পারি না এবং যার প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো অত্যন্ত সীমিত। এই অদৃশ্য বিশালতার নামই হলো ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি সম্ভবত সবচাইতে বড় ধাঁধা, যা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণা পাল্টে দিয়েছে। ডার্ক ম্যাটারকে মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য সুতো বলা যেতে পারে যা সবকিছুকে একত্রে ধরে রাখে। আমরা যখন গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রপুঞ্জের গতির দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত অসঙ্গতি চোখে পড়ে। হিসাব অনুযায়ী, একটি গ্যালাক্সির দৃশ্যমান নক্ষত্রগুলোর ভর যত হওয়া উচিত, তার তুলনায় গ্যালাক্সির ঘূর্ণন গতি অনেক বেশি। মহাকর্ষ বলের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এত দ্রুত ঘুরলে নক্ষত্রগুলো ছিঁটকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিছু একটা অদৃশ্য শক্তি এই নক্ষত্রগুলোকে এক অদ্ভুত মায়ার বাঁধনে আটকে রেখেছে। এই অদৃশ্য বস্তুটিই হলো ডার্ক ম্যাটার। এটি আলো শোষণ করে না, প্রতিফলিত করে না এবং আলো নির্গতও করে না। ফলে টেলিস্কোপ দিয়ে একে দেখা অসম্ভব। এটি কেবল তার মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমেই নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, এই ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের এক ধরণের কাঠামোগত কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে, যার ওপর ভিত্তি করেই মহাজাগতিক সব দৃশ্যমান বস্তু গড়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি হলো আরও রহস্যময় এবং শক্তিশালী এক ধারণা যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক প্রসারণের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আবিষ্কার করেন যা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। আগে ধারণা করা হতো যে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি সময়ের সাথে সাথে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ধীর হয়ে আসবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল মহাবিশ্ব কেবল প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এই প্রসারণের গতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান গতির জন্য দায়ী যে অজ্ঞাত শক্তি, তাকেই বিজ্ঞানীরা ডার্ক এনার্জি নাম দিয়েছেন। মহাকাশের শূন্যস্থানে এই শক্তি বিরাজ করে এবং এটি মহাকর্ষ বলের ঠিক উল্টো কাজ করে অর্থাৎ এটি মহাবিশ্বের সবকিছুকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যদি ডার্ক ম্যাটারকে মহাবিশ্বের ভেতরের বাঁধন হিসেবে ধরা হয়, তবে ডার্ক এনার্জিকে ধরা যায় মহাবিশ্বকে ছিঁড়ে ফেলার এক অন্তহীন বল হিসেবে। এই শক্তির পরিমাণ মহাবিশ্বের মোট শক্তির প্রায় ৬৮ শতাংশ, যা ডার্ক ম্যাটারের তুলনায় অনেক বেশি। ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়, বরং সেখানে এক অদ্ভুত ধরণের শক্তি সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। এটি মহাবিশ্বের ভবিতব্য নির্ধারণে সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করছে। যত সময় যাচ্ছে, ডার্ক এনার্জি ততই শক্তিশালী হচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলোকে একে অপরের থেকে এত দূরে নিয়ে যাচ্ছে যে এক সময় হয়তো আকাশের অন্যান্য নক্ষত্রপুঞ্জ আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাবে।

ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির এই দ্বৈরথ মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। মহাবিশ্বের শুরুর দিকে ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে গ্যাস এবং ধূলিকণা একত্রিত হয়ে নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে ডার্ক এনার্জি তার প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছে। বর্তমানে এই দুই শক্তির ভারসাম্যই নির্ধারণ করছে মহাবিশ্ব কতদিন টিকে থাকবে বা এর শেষ পরিণতি কী হবে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরি এবং মহাকাশ টেলিস্কোপের মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটারের কণাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এখনো কোনো সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী ডার্ক ম্যাটার হলো এমন কিছু কণা যাদের সাথে সাধারণ পদার্থের কোনো বিক্রিয়া হয় না। আবার ডার্ক এনার্জি নিয়ে তত্ত্বগুলো আরও জটিল, যেখানে আইনস্টাইনের কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বা মহাজাগতিক ধ্রুবকের কথা ফিরে ফিরে আসে। এই রহস্যগুলো সমাধান করা মানে হলো অস্তিত্বের একদম গোড়ার কথা জানতে পারা। আমাদের চেনা জগতটি আসলে এক বিশাল অন্ধকার সমুদ্রের ওপর ভাসমান ছোট ছোট দ্বীপের মতো। আমরা যা জানি তা সমুদ্রের উপরের ফেনার মতো সামান্য, আর যা জানি না তা হলো সমুদ্রের সেই অতল গভীরতা। ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি আমাদের শেখায় যে প্রকৃতি তার সব রহস্য সহজে উন্মোচন করে না। মানব সভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে, এই রহস্যের জটগুলো তত বেশি জটিল ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো বিপ্লব আসবে যা ডার্ক ম্যাটারকে দেখার নতুন চোখ দেবে বা ডার্ক এনার্জিকে নিয়ন্ত্রণ করার সূত্র বাতলে দেবে। ততক্ষণ পর্যন্ত এই অদৃশ্য জগতটি আমাদের জন্য এক সীমাহীন বিস্ময় হয়েই থাকবে যা প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এক রহস্যময় ও বিশাল মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ মাত্র। এই অজানাকে জানার প্রচেষ্টাই বিজ্ঞানকে সুন্দর করে তোলে এবং মানুষের কৌতূহলকে আকাশচুম্বী করে রাখে। মহাবিশ্বের এই অন্ধকার রহস্যগুলোই মূলত এর আলোর অস্তিত্বকে সার্থক করে তোলে।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

High-Yield Curation by @steem-seven

Your content has been supported!


Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn up to 0.45 STEEM / 1000 SP.

Click here to see our Tiered Reward System

Vote Proposal 100Vote Witness @seven.witMeet Speak on Steem

We are the hope!

S7VEN Banner