উন্নয়নের মহাসড়কে অদৃশ্য দেয়াল: পদে পদে সিন্ডিকেটের যাঁতাকলে পিষ্ট আমাদের জীবন

in আমার বাংলা ব্লগ7 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




Gemini_Generated_Image_dag5chdag5chdag5.png

আমি এই দেশের খুব সাধারণ একজন নাগরিক। প্রতিদিন সকালে ঘড়ির অ্যালার্মের সাথে পাল্লা দিয়ে উঠি, বাসে ঝুলে অফিসে যাই, মাস শেষে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন পাই, আর দিনরাত হিসাব মেলাই— কীভাবে এই টাকায় পুরো মাসটা পার করব। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আমি হয়তো ভালোই আছি, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, চারদিকে কত বড় বড় প্রকল্প! কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার মতো সাধারণ মানুষের জীবনটা এখন একটা অদৃশ্য সুতোর টানে আটকা পড়ে গেছে। আমরা যেন নিজেদের দেশেই জিম্মি হয়ে আছি একটা অদেখা, অথচ সর্বগ্রাসী দানবের কাছে। আর সেই দানবটার নাম হলো— ‘সিন্ডিকেট’।

দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, পদে পদে এই সিন্ডিকেট কীভাবে আমাদের গলা টিপে ধরেছে, তা কেবল আমার মতো ভুক্তভোগীরাই মর্মে মর্মে টের পায়।

সকালের কাঁচাবাজার: দিন শুরুর প্রথম হতাশা
সকালে বাজারের থলিটা হাতে নিয়ে বের হলেই প্রথম ধাক্কাটা খেতে হয়। যে আলুর কেজি কদিন আগেও স্বাভাবিক ছিল, সেটা হঠাৎ করেই দ্বিগুণ! ডিমের হালি আকাশছোঁয়া, পেঁয়াজের দামে রীতিমতো আগুন। বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলে মুখস্থ উত্তর, "ভাই, সাপ্লাই নাই, আড়তেই দাম বেশি।" অথচ আমরা খবরে দেখি, হিমাগারে লাখ লাখ টন আলু মজুত পড়ে আছে, পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে, তবু বাজারে ছাড়ছে না। প্রান্তিক কৃষক যে দামে ফসল বেচে, আমার হাত পর্যন্ত আসতে আসতে সেই দাম চারগুণ হয়ে যায়। মাঝখানের এই বিশাল মুনাফাটা কারা লুটে নিচ্ছে? ওই বাজার সিন্ডিকেট। তাদের কাছে সরকার, প্রশাসন— সবকিছু যেন অসহায়। আর আমার মতো সাধারণ মানুষ পকেট খালি করে, অর্ধেক বাজার নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফেরে।

রাস্তায় নামলেই জিম্মি: পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য
বাজারের হতাশা পকেটে পুরে যখন রাস্তায় নামি, সেখানেও আরেক সিন্ডিকেট ওত পেতে আছে। বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দেয় একটা, আর কন্ডাক্টর আদায় করে আরেকটা। প্রতিবাদ করতে গেলে অপমানিত হতে হয়। কেন এই রুটে ভালো কোনো বাস সার্ভিস নেই? কেন এত লক্কড়ঝক্কড় বাস? কারণ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিশাল এক সিন্ডিকেট পুরো রুটটাকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছে। এখানে নতুন কেউ ভালো সেবা নিয়ে আসতে চাইলেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে, চরম ঝুঁকি আর অপমান সয়েই আমাদের প্রতিদিন ওই সিন্ডিকেটের বেঁধে দেওয়া নিয়মেই যাতায়াত করতে হয়।

চিকিৎসায় নৈরাজ্য: জীবনের চেয়ে যখন কমিশনের দাম বেশি
সবচেয়ে বড় ভয় লাগে যখন পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়। হাসপাতালে পা রাখলেই যেন মনে হয় কোনো কসাইখানায় ঢুকেছি। ডাক্তারের চেম্বারে গেলে একগাদা টেস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়, আর অলিখিত নিয়ম থাকে— নির্দিষ্ট ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেই টেস্ট করাতে হবে। কারণ সেখানে ডাক্তারের ‘কমিশন’ বা সিন্ডিকেটের ভাগ আছে। ওষুধের দামও হঠাৎ করে হু হু করে বাড়ে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে এই যে নোংরা ব্যবসা, এই যে সিন্ডিকেট— এর কাছে একজন অসহায় রোগীর আর্তনাদ কিছুই না। টাকা না থাকলে এই দেশে এখন সুস্থ হয়ে বাঁচারও যেন কোনো অধিকার নেই।

উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ও চাঁদাবাজির অদৃশ্য দেয়াল
চাকরির বাজারে হতাশা দেখে আমার মতো অনেকেই হয়তো ভাবে, "থাক, নিজে কিছু একটা করি। একটা ছোট ব্যবসা শুরু করি।" কিন্তু সেখানেও পদে পদে বাধা। দোকান ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে মালপত্র আনা— সব জায়গায় স্থানীয় পাতি নেতা আর চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট। আপনি চাইলেই স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারবেন না। কাঁচামাল সাপ্লাইয়ের নির্দিষ্ট লোক আছে, তাদের কাছ থেকেই বেশি দামে নিতে হবে। প্রতিবাদ করলে ব্যবসা তো দূরের কথা, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় একটা দেশের তরুণ সমাজ কীভাবে নতুন কিছু করার সাহস পাবে?

কেন এটিই উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা?
আমরা হয়তো জিডিপি প্রবৃদ্ধির গল্প শুনি, বড় বড় ব্রিজের দিকে তাকিয়ে গর্ববোধ করি। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি শুধু ইট-পাথরের কাঠামোতে হয় না; হয় মানুষের জীবনযাত্রার মানে। যখন একটা দেশে সৎভাবে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যায়, যখন পরিশ্রমের ফল পরিশ্রমী মানুষ না পেয়ে কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী লুটে নেয়, তখন সেই দেশের মেরুদণ্ড ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যেতে থাকে।

এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা আমাদের সমাজকে দুটো জিনিস শেখাচ্ছে— প্রথমত, সততা মানেই বোকামি। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা আর জোটবদ্ধ দুর্নীতি থাকলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা যায়। মেধা, পরিশ্রম আর সততার কোনো মূল্যায়ন এই ব্যবস্থায় নেই। যে দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবে, "আজ আবার কোথায়, কীভাবে ঠকব?"— সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে যতই বড় হওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, ভেতরের এই পচন তাকে একদিন ঠিকই টেনে নিচে নামাবে।

আমরা সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চাই না। আমরা শুধু চাই নিজের ঘাম ঝরানো আয়ের টাকাটার একটা সঠিক মূল্য। আমরা চাই বাজারে গিয়ে স্বস্তিতে দুটো ডাল-ভাত কেনার অধিকার, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা আর অসুস্থ হলে বিনা শোষণে চিকিৎসা পাওয়ার পরিবেশ। এই অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেটের শিকলগুলো না ভাঙতে পারলে, আমাদের সমস্ত উন্নয়নই শুধু খাতা-কলমে আর ওপরের তলাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সাধারণ মানুষের ঘরে সেই উন্নয়নের আলো কোনোদিনই পৌঁছাবে না।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

This post has been upvoted by @italygame witness curation trail


If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness




CLICK HERE 👇

Come and visit Italy Community