হৃদয়ের গহীনে যার বসতি, তাকে ভালো রাখাটা কোনো দায়িত্ব নয়— একান্তই এক পরম প্রাপ্তি

in আমার বাংলা ব্লগ8 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




Gemini_Generated_Image_qi9qccqi9qccqi9q.png

আমরা প্রায়ই শুনি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা নাকি খুব কঠিন একটা কাজ। অনেকেই বলেন, একটা সম্পর্ক সুন্দর রাখতে গেলে নাকি প্রচুর স্যাক্রিফাইস করতে হয়, অনেক ছাড় দিতে হয়, নিজের ইচ্ছেগুলোকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হয়। চারপাশের এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে কথাগুলো হয়তো খুব একটা মিথ্যা নয়। কিন্তু যখন আপনি সত্যিই কাউকে নিজের অন্তরের একেবারে গভীর থেকে ভালোবাসবেন, তখন এই কাঠখোট্টা হিসাব-নিকাশগুলো বড্ড বেমানান আর অদ্ভুত মনে হবে। সত্যি বলতে কী, কাউকে মন থেকে ভালোবাসলে তাকে ভালো রাখাটা কোনো কাজই মনে হয় না। এটা তখন আর কোনো দায়িত্বের গণ্ডিতে বা বাধ্যবাধকতায় আটকে থাকে না, বরং এটা হয়ে ওঠে একটা অভ্যাস, একটা পরম প্রয়োজন— ঠিক নিজেরই বেঁচে থাকার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো। যখন ভালোবাসার মানুষটার মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে, তখন নিজের ভেতরের সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। তাই যে মানুষটাকে আপনি আপনার পুরোটা সত্তা দিয়ে, বিনা শর্তে ভালোবাসেন, তাকে ভালো রাখাটা কোনো কঠিন ব্যাপারই নয়। বরং তাকে ভালো রাখতে না পারাটাই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় কষ্টের, সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার।

ভালো রাখা মানেই কিন্তু দামি কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে নিয়ে যাওয়া নয়, বা মাসের শেষে শপিং মল থেকে দামি কোনো উপহার কিনে এনে চমকে দেওয়া নয়। ভালো রাখা মানে হলো খুব ছোট্ট ছোট্ট অনুভূতিগুলোকে যত্ন করে আগলে রাখা। এই যেমন ধরুন, প্রচণ্ড কাজের চাপের মাঝেও একটু সময় বের করে একটা মেসেজ দিয়ে বলা, "খেয়েছো ঠিকমতো? সাবধানে থেকো।" কিংবা তার ভীষণ মন খারাপের কোনো এক গুমোট দিনে, কোনো কারণ ছাড়াই তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলা, "আমি তো আছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।" এই যে ছোট ছোট নির্ভরতার জায়গাগুলো, এগুলো তৈরি করার জন্য কিন্তু আলাদা করে কোনো প্ল্যান করতে হয় না, রুটিন বানাতে হয় না। ভালোবাসা যখন সত্যি হয়, তখন এই কাজগুলো ভেতর থেকেই খুব স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে। তার চোখের দিকে তাকালেই যেন পড়া যায় তার মনের লুকানো ভাষা। সে হয়তো অভিমানে মুখ ফিরিয়ে আছে, মুখে কিছুই বলছে না, কিন্তু তার ওই বোবা নীরবতার মাঝেই আপনি ঠিক বুঝে নিচ্ছেন তার ভেতরে কতটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এই যে বুঝতে পারা, এই যে তার না বলা কথাগুলো শুনে ফেলা— এটাই তো ভালো রাখার সবচেয়ে সুন্দর এবং জাদুকরী উপায়। আর যে মন থেকে ভালোবাসে, সে এই অনুভূতির ভাষাটা খুব অনায়াসেই পড়তে পারে।

অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভিযোগ করেন যে সম্পর্কের পেছনে সময় দিতে দিতে তারা বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অপর দিকের মানুষটাকে সবসময় খুশি করতে গিয়ে নিজের জীবন নাকি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এমন কথা শুনলে মাঝে মাঝেই আমার বড্ড অবাক লাগে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, তারা কি সত্যিই কোনোদিন ভালোবেসেছিলেন? কারণ ভালোবাসা তো কোনো দশটা-পাঁচটার চাকরির দায়িত্ব নয় যে ডিউটি শেষ হলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে হবে! ভালোবাসার মানুষটার জন্য কিছু করতে পারার মাঝেই তো জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ, সবচেয়ে বড় তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে। আপনি যখন কাউকে আপনার আত্মার অংশ করে নেবেন, তখন তার হাসিমুখটা দেখার জন্য আপনার নিজেরই মন অদ্ভুত এক ব্যাকুলতায় ছটফট করবে। নিজের সবটুকু দিয়ে হলেও আপনি চাইবেন ওই মানুষটার জীবনের আকাশটাতে যেন কোনোদিন কোনো কালো মেঘ না জমে। তার জন্য করা কোনো কিছুই তখন আপনার কাছে 'ত্যাগ' বা 'স্যাক্রিফাইস' মনে হবে না। বরং মনে হবে, "এটাই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক, আমার ভালোবাসার মানুষের জন্য আমি করব না তো কে করবে?" এই যে নিঃস্বার্থভাবে শুধু দিয়ে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এটাই প্রমাণ করে যে ভালোবাসলে কাউকে ভালো রাখাটা কোনো আলাদা পরিশ্রমের বিষয় নয়, বরং এটা আত্মার একটা খোরাক।

রাতের পর রাত জেগে হয়তো আপনি ভীষণ ক্লান্ত, সারা দিনের খাটনিতে চোখের পাতা এক হয়ে আসছে ঘুমে। কিন্তু ঠিক সেই গভীর রাতেই আপনার প্রিয় মানুষটার মন ভীষণ খারাপ, সে হয়তো পুরোনো কোনো কষ্ট মনে করে একটু কাঁদতে চাইছে আপনার কাছে, কিংবা স্রেফ আপনার গলাটা শুনতে চাইছে। আপনি কি তখন বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দেবেন? না। বরং আপনি নিজের সেই পরম কাঙ্ক্ষিত ঘুমকে হাসিমুখে বিসর্জন দিয়ে তার কথা শুনবেন, তাকে শান্ত করবেন। এই যে আপনি নিজের এত প্রিয় ঘুমটা ছেড়ে দিলেন, এটা কি পরদিন সকালে আপনার কাছে কোনো কষ্ট মনে হবে? একটুও না। কারণ ওই মুহূর্তে আপনার কাছে আপনার ঘুমের চেয়েও হাজার গুণ বেশি দামি হলো আপনার ভালোবাসার মানুষটার মানসিক শান্তি। আপনি খুব ভালো করেই জানেন, ওই অন্ধকার রাতে আপনি পাশে থাকলে সে ভরসা পাবে, সে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। আর তার ওই শান্তির ঘুমটুকুই আপনার সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ভালোবেসে এই যে নিজের একটুখানি সুখ অবলীলায় বিসর্জন দেওয়া, এটা কোনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যবাধকতা থেকে আসে না। আসে বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা এক গভীর মায়া থেকে। যে মায়ার বাঁধনে জড়ালে মানুষ নিজের চেয়েও বেশি অন্য একজনকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে।

পৃথিবীর কোনো মানুষই নিখুঁত নয়। প্রতিটি মানুষেরই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকে। কেউ হয়তো কথায় কথায় ভীষণ রেগে যায়, কেউ হয়তো একটু বেশিই অভিমানী, আবার কারো হয়তো অতীত নিয়ে অনেক না-বলা কষ্ট বুকে পাথর হয়ে জমে আছে। যখন আমরা কাউকে ভালোবাসার সিদ্ধান্ত নিই, তখন শুধু তার ভালো গুণগুলোকে ভালোবাসলে চলে না; তার এই ত্রুটি, এই দুর্বলতা, এই অগোছালো দিকগুলোকেও পরম মমতায় আপন করে নিতে হয়। সত্যি বলতে, যখন ভালোবাসা গভীর হয়, তখন এই দুর্বলতাগুলোকে আর বিরক্তির কারণ মনে হয় না। তখন মনে হয়, এই মানুষটার এই ভাঙা মনটা জোড়া লাগানোর দায়িত্ব তো শুধুই আমার। তার ভেতরের লুকিয়ে থাকা ভয়গুলোকে দূর করে, তাকে একটা নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার নামই তো ভালোবাসা। যখন কেউ সত্যিই ভালোবাসে, তখন সে তার সঙ্গীর এই ছোট ছোট ভুলগুলোকে ক্ষমা করে দেয় খুব সহজেই। তাকে জোর করে বদলে দেওয়ার চেষ্টা না করে, তাকে তার মতো করেই আরও সুন্দরভাবে বাঁচতে শেখায়। এই যে একটা মানুষকে তার সমস্ত অসম্পূর্ণতা সমেত বুকে টেনে নেওয়া, এটাই তো তাকে ভালো রাখার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আর এই কাজটা করতে কোনো কাঠখড় পোড়াতে হয় না, শুধু বুকে এক আকাশ সমান নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকলেই হয়।

জীবনের রাস্তাটা তো আর সবসময় ফুল বিছানো মসৃণ হয় না। কখনো কখনো এমনও ঝড় আসে যখন মনে হয় চারপাশের সবকিছু নিমেষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেই কঠিন সময়গুলোতে, সেই ঘোর অমানিশায় ভালোবাসার আসল পরীক্ষা হয়। একটা মানুষ যখন মানসিকভাবে বা সামাজিকভাবে একদম ভেঙে পড়ে, তখন তাকে ভালো রাখাটা হয়তো অন্যদের চোখে একটু চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ভালোবাসা যদি খাঁটি হয়, তবে সেই চ্যালেঞ্জটাও নিতে ভীষণ ভালো লাগে। তখন মনে হয়, পুরো পৃথিবী যদি আজ ওর বিপক্ষে চলেও যায়, সবাই যদি ওকে ছেড়ে চলেও যায়, তবুও আমি ওর হাতটা ছাড়ব না। ওকে আমি আগলে রাখব আমার সবটুকু ক্ষমতা আর অস্তিত্ব দিয়ে। এই যে একটা অটুট বিশ্বাস আর অন্ধ নির্ভরতা, এটা শুধু ভালোবাসলেই তৈরি হয়। ভালোবাসার মানুষটাকে ভালো রাখার জন্য তখন আর নিজের কোনো আলাদা অস্তিত্বের কথা, নিজের কোনো আলাদা স্বার্থের কথা মাথাতেই আসে না। শুধু মনে হয়, ও ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকব। ওর ভালো থাকার মাঝেই আমার পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সমস্ত পূর্ণতা লুকিয়ে আছে।

আসলে ভালোবাসা হলো একটা আয়নার মতো। আপনি যখন কাউকে মন থেকে চাইবেন, তখন তার ভালো থাকার প্রতিচ্ছবি আপনি আপনার নিজের ভেতরেও খুব স্পষ্ট দেখতে পাবেন। তাকে ভালো রাখার জন্য আপনি যখন হঠাৎ করে ছোট ছোট সারপ্রাইজ দেবেন, তার পছন্দের খাবারটা নিজের হাতে রান্না করবেন, বা রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে আলতো করে তার হাতটা আগলে ধরবেন— এই প্রতিটি সাধারণ কাজের মাঝে আপনি নিজেও যে পরিমাণ অদ্ভুত আনন্দ পাবেন, তা পৃথিবীর কোনো পাল্লায় মেপে বোঝানো সম্ভব নয়। আমরা সবাই জীবনে দিনশেষে একটুখানি শান্তি খুঁজি। আর একজন ভালোবাসার মানুষকে ভালো রাখার মাঝে যে স্বর্গীয় একটা শান্তি আছে, তা যারা সত্যিই ভালোবেসেছে, কেবল তারাই জানে। এটা এমন একটা অনুভূতি যা হাজারটা শব্দ দিয়েও কাউকে বলে বোঝানো যায় না, এটা শুধু চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে হয়।

পরিশেষে শুধু এটুকুই মনে হয়, ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, এর কোনো ধরাবাঁধা ব্যাকরণ নেই। তবে ভালোবাসার খুব সুন্দর, খুব সাধারণ একটা ভাষা আছে, আর তা হলো 'যত্ন'। যে মানুষটা আপনার জন্য নিজের জীবনের সবকিছু একটু হলেও পরিবর্তন করতে রাজি, যে মানুষটা আপনার একটুখানি মন খারাপে নিজের দুনিয়াটাকে এলোমেলো করে ফেলে, তাকে ভালো রাখাটা আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কাজগুলোর একটা হওয়া উচিত। আর এই কাজটা যদি সত্যি আপনি মন থেকে করেন, তবে দেখবেন এটা আলাদা করে কোনো কাজই নয়। এটা হলো নিশ্বাস নেওয়ার মতো একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। আমরা যেমন বেঁচে থাকার জন্য কোনো কষ্ট ছাড়াই অনায়াসে নিশ্বাস নিই, ঠিক তেমনি ভালোবাসলে প্রিয় মানুষটাকে ভালো রাখার কাজটাও একদম নিজের অজান্তেই হয়ে যায়। সেখানে কোনো জোর থাকে না, কোনো হিসেব থাকে না, কোনো ক্লান্তি থাকে না; থাকে শুধু এক বুক পবিত্র মায়া, স্নিগ্ধতা আর এক অনন্তকালের নির্ভরতা। তাই তো বলি, বুকের বাঁ পাশে যদি সত্যিই ভালোবাসা থাকে, তবে তাকে ভালো রাখা কোনো ব্যাপারই না।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

High-Yield Curation by @steem-seven

Your content has been supported!


Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn up to 0.45 STEEM / 1000 SP.

Click here to see our Tiered Reward System

Vote Proposal 100Vote Witness @seven.witMeet Speak on Steem

We are the hope!

S7VEN Banner