“যোগ্যতা নয়, পরিচিতি—তাহলে কি মেধার মূল্য আজ শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ?”

in আমার বাংলা ব্লগ6 hours ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



বর্তমান সমাজে একটি প্রশ্ন দিন দিন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে—সফল হওয়ার জন্য কি সত্যিই যোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নাকি পরিচিতি ও প্রভাবই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি? আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসি, “ভালো করে পড়াশোনা করো, যোগ্য হও, পরিশ্রম করো—সফলতা তোমার পিছু নেবে।” কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক সময় এমন দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে মেধাবী ও যোগ্য মানুষ সুযোগের অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়, অথচ কম যোগ্য কেউ শুধুমাত্র পরিচিতি, প্রভাব বা “নিজের মানুষ” থাকার কারণে সহজেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে যায়। এই বাস্তবতা শুধু হতাশাজনক নয়, সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগেরও কারণ।

চাকরির বাজারের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই গোপনে আগে থেকেই ঠিক করা থাকে কে সেই পদে বসবে। বাইরে থেকে হাজারো আবেদন নেওয়া হয়, পরীক্ষা হয়, সাক্ষাৎকার হয়—কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিটি যায় সেই ব্যক্তির কাছে, যার “ভিতরের লাইন” আছে। তখন প্রশ্ন জাগে, এত কষ্ট করে পড়াশোনা, দক্ষতা অর্জন, অভিজ্ঞতা—এসবের মূল্য কোথায়? একজন মেধাবী তরুণ যখন বারবার ব্যর্থ হয়ে দেখে কম যোগ্য কেউ পরিচিতির জোরে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তার ভেতরে হতাশা জন্ম নেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

এমন বাস্তবতা শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ব্যবসা, রাজনীতি, বিনোদন, এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রেও পরিচিতির প্রভাব অনেক সময় যোগ্যতাকে ছাপিয়ে যায়। অনেক মেধাবী মানুষ সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়, কারণ তাদের পাশে “বড় কেউ” নেই। অন্যদিকে কিছু মানুষ কেবল সম্পর্কের শক্তিতে এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে হয়তো তাদের দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। এর ফলে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—“যোগ্য হওয়া নয়, পরিচিত মানুষ থাকা বেশি জরুরি।” এই ধারণা তরুণ প্রজন্মের মনোভাব ও পরিশ্রমের আগ্রহ দুটোই নষ্ট করে দেয়।

তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। পরিচিতি থাকা সবসময় খারাপ কিছু নয়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা—এটাও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। কারণ সমাজে একা কেউ খুব বেশি দূর যেতে পারে না। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন পরিচিতি যোগ্যতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। একজন অযোগ্য ব্যক্তি যদি শুধু ক্ষমতা বা পরিচয়ের জোরে দায়িত্বপূর্ণ স্থানে বসে, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একজন মেধাবী মানুষের হয় না; পুরো প্রতিষ্ঠান, এমনকি সমাজও এর মূল্য দেয়। একজন অদক্ষ চিকিৎসক, অযোগ্য কর্মকর্তা বা দুর্বল নেতৃত্বের কারণে বহু মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে।

আমাদের সমাজে বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণও এটি। একই যোগ্যতা থাকার পরও কেউ সুযোগ পায়, কেউ পায় না—শুধু সামাজিক অবস্থান, পরিবারের পরিচয় বা প্রভাবশালী সংযোগের কারণে। একজন সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীকে যেখানে প্রতিটি ধাপে লড়াই করতে হয়, সেখানে সুবিধাপ্রাপ্ত কেউ অনেক সহজে দরজা খুলে ফেলতে পারে। এতে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, “যোগ্যতা দিয়ে কিছু হয় না।” আর এই মানসিকতা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, যখন মেধাবীরা বারবার অবহেলিত হয়, তখন তারা হয় হতাশ হয়ে যায়, নয়তো দেশ ছেড়ে অন্যত্র সুযোগ খুঁজতে বাধ্য হয়। ফলে একটি দেশ তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—যোগ্য ও সৎ মানুষদের হারাতে থাকে। এটাকে অনেকে “মেধা পাচার” বলে। যে সমাজে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

তবে কি সফলতার জন্য পরিচিতি থাকা একেবারেই ভুল? না, ভুল নয়। বাস্তবতা হলো—আজকের পৃথিবীতে যোগ্যতার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, সম্পর্ক তৈরি করা এবং মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি কখনোই মেধা ও পরিশ্রমকে বাদ দিয়ে নয়। পরিচিতি দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই জায়গায় টিকে থাকতে হলে যোগ্যতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ প্রভাব দিয়ে হয়তো সুযোগ পাওয়া যায়, কিন্তু দক্ষতা ছাড়া সেই অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে রাখা যায় না।

আমাদের সমাজে প্রয়োজন একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে পরিচয়ের আগে যোগ্যতাকে মূল্য দেওয়া হবে। চাকরিতে স্বচ্ছতা, প্রতিষ্ঠানে ন্যায্য মূল্যায়ন, দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ—এসব নিশ্চিত না হলে মেধাবীদের হতাশা আরও বাড়বে। তরুণদেরও বুঝতে হবে, শুধু অভিযোগ করে থেমে গেলে হবে না; নিজেকে দক্ষ করে তোলা জরুরি। কারণ সব দরজা হয়তো পরিচিতির মাধ্যমে খোলে না—অনেক দরজা এখনও মেধা, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম দিয়েও খোলা সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—“যোগ্যতা নয়, পরিচিতি—এটাই কি এখন সফলতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি?” হয়তো অনেক ক্ষেত্রে উত্তর হবে “হ্যাঁ”। কিন্তু এই “হ্যাঁ” যদি স্থায়ী সত্যে পরিণত হয়, তাহলে সমাজ একদিন এমন জায়গায় পৌঁছাবে, যেখানে মেধা হার মানবে প্রভাবের কাছে, আর ন্যায়বিচার হারিয়ে যাবে সুবিধাবাদের ভিড়ে। একটি সুস্থ সমাজ কখনোই এমন বাস্তবতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে পারে না। কারণ পরিচিতি মানুষকে সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের উন্নতি ও সম্মান এনে দেয় একমাত্র যোগ্যতাই।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

This post has been upvoted by @italygame witness curation trail


If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness




CLICK HERE 👇

Come and visit Italy Community